24/09/2026
বেওয়ারিশ কুকুর—নাকি মানুষের দেওয়া একটি পরিচয়?
নৈশপ্রহরী নিউজ | সচেতনতামূলক প্রতিবেদন
কিছুদিন পরপরই বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে এমন শিরোনাম চোখে পড়ে—“বেওয়ারিশ কুকুরের উপদ্রব”, “বেওয়ারিশ কুকুরের আক্রমণে আহত”, “বেওয়ারিশ কুকুরে অতিষ্ঠ এলাকাবাসী” ইত্যাদি।
কুকুরের কামড় বা আক্রমণ অবশ্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সমস্যা। বিশেষ করে জলাতঙ্কের ঝুঁকি থাকায় কুকুরের কামড়কে কোনোভাবেই হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) বলছে, কুকুরের মাধ্যমে মানুষের জলাতঙ্ক সংক্রমণ ঘটে এবং কুকুরের ব্যাপক টিকাদান জলাতঙ্ক নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে কার্যকর উপায়গুলোর একটি।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—রাস্তায় ঘুরছে বলেই কি একটি কুকুরকে “বেওয়ারিশ” বলা যায়?
আন্তর্জাতিক প্রাণিস্বাস্থ্য সংস্থা WOAH-এর ব্যবহৃত ধারণা অনুযায়ী, মুক্তভাবে ঘোরাফেরা করা কুকুরের মধ্যে মালিকানাধীন কুকুরও থাকতে পারে, আবার মালিকবিহীন কুকুরও থাকতে পারে। অর্থাৎ কোনো কুকুরকে বাইরে ঘুরতে দেখা গেলেই সেটির কোনো মালিক, অভিভাবক বা মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক নেই—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়।
অনেক এলাকায় এমন কুকুর রয়েছে যাদের কোনো নির্দিষ্ট মালিক নেই, কিন্তু স্থানীয় মানুষ নিয়মিত খাবার দেয়, চিকিৎসা করায় কিংবা টিকা দেয়। আবার এমন মালিকানাধীন কুকুরও রয়েছে যাদের দিনের কোনো সময় বাইরে ঘোরাফেরা করতে দেওয়া হয়।
তাই সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে “বেওয়ারিশ” শব্দটি ব্যবহার করার আগে তথ্য যাচাই করা জরুরি।
কুকুরটি সত্যিই মালিকবিহীন কি না?
তার পরিচর্যা করে কেউ কি না?
কুকুরটি আগে থেকেই ওই এলাকায় বসবাস করে কি না?
আক্রমণের ঘটনাটি কীভাবে ঘটেছে?
কুকুরটি অসুস্থ বা জলাতঙ্কে আক্রান্ত বলে কোনো পরীক্ষিত তথ্য আছে কি না?
এসব প্রশ্নের উত্তর না জেনে শুধু “বেওয়ারিশ কুকুর” লিখে বড় শিরোনাম তৈরি করলে সাধারণ মানুষের মধ্যে সব কুকুর সম্পর্কে ভয় বা নেতিবাচক ধারণা তৈরি হতে পারে।
তাহলে কি কুকুরের আক্রমণের খবর প্রকাশ করা যাবে না?
অবশ্যই যাবে। বরং মানুষের নিরাপত্তার জন্য এসব ঘটনা যথাযথভাবে প্রকাশ করা প্রয়োজন।
তবে সংবাদ হওয়া উচিত তথ্যনির্ভর, আতঙ্কনির্ভর নয়।
“বেওয়ারিশ কুকুরের আক্রমণ” বলার পরিবর্তে প্রয়োজনে বলা যেতে পারে—
“মুক্তভাবে ঘোরাফেরা করা কুকুরের কামড়ে আহত…”
আর যদি সত্যিই প্রমাণ থাকে যে কুকুরটির কোনো মালিক নেই, তখন “মালিকবিহীন কুকুর” বলা আরও নির্দিষ্ট হতে পারে।
সমাধান কি কুকুর নিধন?
এখানেও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে।
WHO স্পষ্টভাবে বলছে, শুধু মুক্তভাবে ঘোরাফেরা করা কুকুর হত্যা করে জলাতঙ্ক নিয়ন্ত্রণ করা কার্যকর পদ্ধতি নয়। বরং ব্যাপক কুকুরের টিকাদান, নজরদারি, দায়িত্বশীল মালিকানা এবং কামড়ের পর দ্রুত চিকিৎসা—এসব ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
WOAH-ও কুকুরের জনসংখ্যা ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে মালিকানাধীন ও মালিকবিহীন—উভয় ধরনের কুকুরকে বিবেচনায় নেওয়ার কথা বলে। এর মধ্যে টিকাদান, নির্বীজন, দায়িত্বশীল মালিকানা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী অন্যান্য মানবিক ব্যবস্থাপনা অন্তর্ভুক্ত।
অর্থাৎ সমস্যার সমাধান শুধু “কুকুর আছে, তাই সরিয়ে দাও”—এমন সরল সমীকরণ নয়।
মানুষের দায়িত্বও কি আছে?
অবশ্যই।
যে মানুষ কুকুর পোষেন, তার দায়িত্ব কুকুরকে টিকা দেওয়া, নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং পরিত্যাগ না করা।
আবার সমাজের দায়িত্ব হলো—মালিকবিহীন কুকুরের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে বৈজ্ঞানিক ও মানবিক পদ্ধতি গ্রহণ করা এবং জলাতঙ্ক প্রতিরোধে টিকাদান নিশ্চিত করা।
কারণ WOAH-এর ভাষায়, কুকুরের চলাচল ও জনসংখ্যার সঙ্গে মানুষের কর্মকাণ্ডেরও সম্পর্ক রয়েছে। দায়িত্বশীল কুকুর পালন ভবিষ্যতে মুক্তভাবে ঘোরাফেরা করা কুকুরের সংখ্যা কমাতেও সহায়তা করতে পারে।
সংবাদমাধ্যমের কাছে একটি প্রশ্ন
একটি কুকুর রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে—এটা কি তার পরিচয়?
নাকি সেটি শুধু তার অবস্থান?
একটি প্রাণী মানুষের তৈরি শহরে মানুষের ফেলে দেওয়া খাবারের ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকলে, তাকে “বেওয়ারিশ” বলার আগে আমাদের কি একবার ভাবা উচিত নয়—সে বেওয়ারিশ হয়েছে কীভাবে?
কেউ তাকে জন্ম দিয়েছে, কেউ হয়তো পোষ্য করেছে, আবার কোনো একসময় তাকে রাস্তায় ফেলে দিয়েছে। কেউ খাবার দিয়েছে, কেউ তাড়িয়েছে, কেউ অসুস্থ অবস্থায় চিকিৎসা করেছে।
তাই কুকুরের আক্রমণের ঘটনা যেমন গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করতে হবে, তেমনি কোন কুকুরকে কেন “বেওয়ারিশ” বলা হচ্ছে—সেটিও সাংবাদিকতার দায়িত্বশীলতার অংশ।
ভয় নয়, প্রয়োজন সঠিক তথ্য।
বিদ্বেষ নয়, প্রয়োজন বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা।
আর কুকুরের কামড়ের ঘটনা ঘটলে আতঙ্কিত না হয়ে দ্রুত ক্ষত পরিষ্কার করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং প্রয়োজনীয় জলাতঙ্ক প্রতিরোধী চিকিৎসা গ্রহণ করা জরুরি।
প্রশ্নটা তাই কুকুরের বিরুদ্ধে নয়—প্রশ্নটা আমাদের শব্দচয়ন, দায়িত্ববোধ এবং সমস্যার বৈজ্ঞানিক সমাধান নিয়ে।
নৈশপ্রহরী