25/03/2024
#প্রসঙ্গঃ কুকুর-বিড়ালের স্কিন ইনফেকশন (ডার্মাটাইটিস)ও লোম পড়া।
আমরা যারা কুকুর-বিড়াল পালি তাদের সবাইকেই একটা সমস্যা মোটামোটি ফেস করতেই হয়। সেটা হলো ছবির মতো চোপ ছোপ লোম পড়া এবং ঐ জায়গায় চুলকে ঘা করে ফেলা। ভেটেরিনারি ডার্মাটোলজির ভাষায় যা ডার্মাটাইটিস নামে পরিচিত।আমাদের ইনবক্স এ অনেকেই এটা নিয়ে লিখার অনুরোধ করায় আমরা আজকে এটা নিয়ে লিখছি। তো চলুন জেনে নেয়া যাক এটা কেন হয় এবং এটা থেকে বাচার উপায় কি? (আপনাদের বুঝার সুবিধার্থে আসল মেডিকেল টার্ম ব্যবহার না করে আমরা এই পোষ্ট এ সাধারন ভাবে স্কিন ইনফেকশন শব্দ টি ব্যবহার করছি)
আসলে স্কিন ইনফেকশন আপনার ফার বেবির(কুকুর-বিড়ালের) খুব কমন সমস্যা। এটা সাধারনত বিভিন্ন ধরনের এলার্জেন(ধুলাবালি, ফুলের রেনু, ক্যামিকেল, পোকার কামড় ইত্যাদি) এর প্রতি হাইপার সেনসিটিভিটি বা এলার্জির কারনে হয়ে থাকে। এছাড়াও ফ্লী, মাইট এবং বিভিন্ন ধরনের বহিঃপরজীবি দ্বারা হয়ে থাকে। ফ্লী সম্পর্কে যেহেতু আমাদের পোষ্টে আগে আলোচনা করা হয়েছে তাই ফ্লী বাদ দিয়ে নন ফ্লী এলার্জিক ডার্মাটাইটিস নিয়ে আজকে কথা বলবো।
#কারনঃ
১.বিভিন্ন ধরনের এলার্জিক খাবার (প্রানী ভেদে ভিন্ন হয়)
২. খাবার ছাড়া বিভিন্ন ধরনের এলার্জেন যেমনঃ
✔ধুলাবালিঃ এক্ষেত্রে সাধারনত বাইরে খেলাধুলার পর, ধুলো জমা কার্পেট এ বসলে বা খেলাধুলা করলে চুলকানি বেশি হয়। আমাদের দেশে শীতকালে এমন সমস্যা বেশি দেখা যায়
✔ফুলের রেনুঃ সাধারনত বসন্ত কালে এ সমস্যা টা বেশি হয়
✔পোকামাকড়ঃ বিছা, চ্যালা, মশা ইত্যাদি
✔শ্যাম্পু, পিওর ভিনেগার (এজন্যই পানি মিশিয়ে ইউজ করা হয়), বিভিন্ন ধরনের ক্যামিকেল
৩.এক্সটার্নাল প্যারাসাইট
৪. ফাংগাল ইনফেকশন
৫. প্লাস্টিকের বাটিতে খাবার দেওয়া (মুখের চার পাশের স্কিন এ ইনফেকশন হয়) ইত্যাদি।
#লক্ষনঃ
১. ছোপ ছোপ হয়ে চুল পড়া, বিশেষত পিঠে, ঘাড়ের কাছে, কানের গোড়া ও দুই কানের মাঝখানে, কুচকিতে, লেজের গোড়ায় ইত্যাদি জায়গায়
২. চামড়া লাল হয়ে যাওয়া বা চামড়ার রং পরিবর্তন হওয়া
৩. পা দিয়ে চুলকানো
৪. আক্রান্ত জায়গা চাটার চেষ্টা করা
৫. সিভিয়ার কেস এ চামড়া ওঠে যাওয়া এবং ঘা হওয়া
#চিকিৎসাঃ
দুঃখিত। যেহেতু অনেক কারনেই হয় এবং কুকুর-বিড়ালের স্কিন খুবই সেনসিটিভ এবং প্রত্যেকের স্কিন আলাদা তাই ইন জেনারেল কোন হোম রেমিডি বলা সম্ভব নয়। কারো পরামর্শ না নিয়ে যত দ্রুত পারেন ডাক্তারের স্মরনাপন্ন হোন। ডাক্তার রোগের কারন, স্কিন এর ধরন বুঝে স্পেসিফিক চিকিৎসা দিবেন। মনে রাখবেন, আপনার আদরের প্রানীটার জন্য এলার্জিক ডার্মাটাইটিস খুবই বিরক্তিকর এবং একইসাথে এর চিকিৎসা খুবই সময় সাপেক্ষ ও চিকিৎসা ছাড়া খুবই দ্রুত বাড়তে থাকে। তাই যত দ্রুত ডাক্তার এর স্মরনাপন্ন হবেন চিকিৎসার খরচ ও সময় ততো কম লাগবে।
#প্রতিরোধের_উপায়ঃ হ্যা, এটাই আমার আজকের পোষ্টের মুল টার্গেট। কথায় আছে প্রতিকারের থেকে প্রতিরোধই উত্তম। আর এটা স্কিন ইনফেকশন এর ক্ষেত্রে ১১০ শতাংশ সত্যি। কেননা একবার এই সমস্যা শুরু হলে যেমন অনেক দিন লাগে সারতে, একই সাথে বেশিরভাগ সময়ই স্কিন টা আর আগের মতো হয় না। কিছুটা প্রমান থেকেই যায়। আবার নন ফুড এলার্জেন এর কারনে হওয়া এলার্জির কোন স্থায়ী সমাধান ও নেই। তাই সচেতনতাই এক্ষেত্রে মুল চাবি। এক্ষেত্রে যেসকল বিষয় খেয়াল রাখতে হবে সেটা হলোঃ
১. প্রথমেই মনে রাখবেন ডার্মাটাইটিস খুবই ছোয়াছে। এবং খুব দ্রুতই একজন থেকে অন্যজনে ছড়ায়। তাই বাসায় একটা প্রানী আক্রান্ত হলে তাকে অন্যদের থেকে দ্রুতই আলাদা করুন।
২. তার ব্যবহৃত বিছানা-কার্পেট পরিস্কার করুন
৩. অন্য কুকুর বিড়ালের সংস্পর্শে আসা থেকে নিজের প্রানীটাকে যতদুর পারেন বিরত রাখুন। বিশেষত লং হেয়ার ব্রীড গুলো
৪. যেসকল স্থানে অনেক কুকুর-বিড়াল একসাথে হয় সেসকল স্থানে গেলে সাবধানে থাকুন। যেমনঃ পেট শো, পার্ক, পেট শপ।
৫. বিষেষ করে আমাদের দেশে যেসকল পেট শপ আছে, আই মিন যেগুলোতে লাইভ এনিম্যাল বিক্রি করা হয় সেগুলোতে নিজের পোষা প্রানী না নিয়ে যাওয়াই বেস্ট
৬.প্লাস্টিকের বাটিতে খাবার দেওয়া পরিহার করুন
৭.ধুলাবালি থেকে দুরে রাখুন
৮. যদি কোন খাবারে এলার্জি থাকে তাহলে সে খাবার দেওয়া থেকে বিরত থাকুন।
৯. নিয়মিত গ্রুমিং করুন
১০. লং হেয়ার ব্রীড গুলোকে নিয়মিত গোসল করান
১১. তাদের জন্য স্পেশাল শ্যাম্পু পাওয়া যায়। মানুষের শ্যাম্পু ইউজ না করে সেগুলো ইউজ করবেন
১২. নিয়মিত ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড সম্পন্ন খাবার দিন
১৩. নিয়মিত কৃমিনাশক খাওয়ান
১৪.কোন নতুন স্কিন প্রোডাক্ট বা শ্যাম্পু বা ভিটামিন সাপ্লিমেন্ট খাওয়ানোর আগে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নিন।
১৫. ট্রিটমেন্ট করালে একইসাথে ঘরের সকল প্রানীকে করান।নাহলে আবার হতে পারে।
#প্রশ্নঃ লোম পড়া শুরু হওয়ার সাথে সাথে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে না পারলে কি করতে পারি?
উত্তরঃ লোম পড়া বন্ধের জন্য এভাবে সাধারন ভাবে কোন সমাধান দিবো না, এটা এনিম্যাল টু এনিম্যাল ভ্যারি করে। তবে ডাক্তারের পরামর্শ নিতে যদি এক দুই দিন দেরি হয় তবে সেই সময়ের মাঝে যেন চামড়া তুলে না ফেলে বা ঘা না হয় সেজন্য একটা পরামর্শ হলোঃ
"কলার পরিয়ে দিন।" কুকুর-বিড়াল চামড়াতে চুলকালে চেষ্টা করে জায়গাটা চাটার (বিড়াল) অথবা কামড়ানোর (কুকুর) কারন খেয়াল করলে দেখবেন বিড়ালের জিহবাতে ভিতরের দিকে বাকানো কাটার মতো থাকে। সেটা দিয়ে চাটলে জায়গা টা তে চুলকানোর মতো আরাম পাওয়া যায়। কিন্তু সমস্যা হলো বেশি চুলকানোর ফলে ঔ জায়গার চামড়া ওঠে যায় এবং সেখানে মুখের ব্যাক্টেরিয়া দিয়ে ইনফেকশন হয়। ঘা এবং পুজ থাকার ফলাফল স্বরুপ ট্রিটমেন্ট আরো সময় সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল হয়। তাই এমন অবস্থা প্রতিরোধে ছোপ ছোপ লোম পড়া দেখলেই কলার ব্যবহার করা শুরু করুন এবং দ্রুত ডাক্তারের কাছে নিয়ে যান। মনে রাখবেন স্কিন প্রত্যেকের ক্ষেত্রে ডিফারেন্ট। তাই একজনের কুকুর/বিড়াল এই পদ্ধতি তে ভালো হইসে মানে এটা নয় যে আপনার টাও একই পদ্ধতি তে ভালো হবে। হতেও পারে আপনার প্রানীটির গায়ে দেওয়ার সাথে সাথে সিভিয়ার এলার্জিক কন্ডিশন তৈরি হলো। অবস্থা আরো বেশি খারাপ হয়ে গেলো। আবার বিষয় টা এমন ও না যে, এই প্রোডাক্ট এ আপনার বিড়ালের লোম পড়ে তাই অন্য সবার বিড়ালের ও লোম পড়বে। আপনার বিড়াল ওই নির্দিষ্ট জিনিস এর প্রতি এলার্জিক হতেই পারে যেটা সাধারন সব বিড়ালের জন্য এলার্জিক না। তাই এই ব্যপারে অন্য কারো পরামর্শ নেওয়ার আগে ডাক্তারের থেকে পরামর্শ নিন এবং দরকার পড়লে একবারের জায়গায় ডাক্তার কে একশবার বিরক্ত করুন। মনে রাখবেন, প্রানীদের স্কিন মানুষের তুলনায় অনেক সেন্সিটিভ.. তাই ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া কোন স্কিন প্রডাক্ট ইউজ করবেন না। কারন কিছু হলে ভোগান্তিতে পড়বে আপনার আদরের প্রানীটাই।
যেহেতু প্রত্যেকের স্কিন ভিন্ন তাই স্কিন এর ব্যপারে কিছু জানতে হলে কমেন্ট এ ইন জেনারেল কোন সাজেশন না চেয়ে আপনার প্রানীটির ডিটেলস এবং ছবি সহ ইনবক্স করুন।
ডা. আহমদ রাফি,
সিনিয়র কনসালটেন্ট,
কেয়ার এন্ড কিউর ভেটেরিনারি ক্লিনিক,
ধানমন্ডি, ঢাকা