14/04/2026
কারারক্ষীর কাছে এক কাপ চা চেয়েছিলাম। তখন আমার সেলে সব ধরনের খাবার ও পানীয় প্রবেশে কঠোর নিষেধাজ্ঞা। শতভাগ নিশ্চিত ছিলাম যে সে রাজি হবে না, হয়তো গালিগালাজ করবে। কিন্তু অবাক করে দিয়ে কোনো উচ্চবাচ্য না করেই সে রাজি হয়ে গেল।
কিছুক্ষণ পর সে দরজার ছোট ফাঁক দিয়ে হাত বের করতে বলল। আমি যখনই হাত বাড়িয়ে দিলাম, সে চায়ের বদলে আমার হাত জুড়ে ঢেলে দিল ফুটন্ত গরম পানি!
থার্ড ডিগ্রি বার্নের অসহ্য দহন আর যন্ত্রণায় যখন আমি চিৎকার করে কাঁদছিলাম, তখনই অন্ধকারের ভেতর থেকে ছুটে এল হানান। সেও আমার ব্যথায় কাঁদতে শুরু করল। সেদিন সেই অন্ধকার প্রকোষ্ঠে আমরা দুজন অনেকক্ষণ একসাথে কেঁদেছিলাম।
কিছুদিন পর বুঝতে পারলাম হানান মা হতে চলেছে। নিজের আমার দুটি কম্বল থেকে একটি কম্বল ভাঁজ করে মেঝের এক কোণে ওর জন্য বিছানা করে দিলাম। যখন ও বাচ্চা প্রসব করল, ওদের ক্ষুধার কথা ভেবে আমি নিজের খাবারের পরিমাণ কমিয়ে দিলাম। অনেক দিন এমন গেছে, আমার ভাগে থাকা দুটি রুটির দুটোই ওদের দিয়ে আমি না খেয়ে কাটিয়েছি।
কারারক্ষীরা বিষয়টা জেনে গেল। তারা এটাকে অনিয়ম বলে ওদের সরিয়ে নিতে চাইল। আমি কান্নায় ভেঙে পড়লাম, মিনতি করে বললাম— ওদের নিও না প্লিজ, ওরা এই নিঃসঙ্গতায় আমার একমাত্র বন্ধু!
আমার এই আর্তি ওদের মন গলাল না, বরং আমাকে আরও কষ্ট দেওয়ার এক পৈশাচিক নেশায় মাতল ওরা।
খাবারে বিষ মিশিয়ে দেওয়া হলো। প্রায় অভুক্ত বাচ্চাগুলো যখনই সেই খাবার খেল, আমার চোখের সামনে একে একে নিথর হয়ে লুটিয়ে পড়তে লাগল। পাশে বসে আমি কেবল অঝোরে কাঁদছিলাম, আর হানান তার পিঙ্গলরঙা মায়াবী চোখ জোড়া দিয়ে অসহায়ভাবে তাকিয়ে ছিল। ঠিক সেই মুহূর্তে এক পাষণ্ড কারারক্ষী তার ভারী বুট দিয়ে পিষে দিলো হানানের মাথা ও মুখ।মুহুর্তে ও মারা গেলে, চিৎকার করা সুযোগ অবধি পেলো না।
ওর একমাত্র অপরাধ ছিল এক নিঃসঙ্গ বন্দিনীকে সঙ্গ দেওয়া।দেহে প্রাণ থাকা পর্যন্ত আমার হৃদয়ের মণিকোঠায় বেঁচে থাকবে আমার প্রিয় হানান, আমার আদরের বেড়ালটা।
ওয়াফা ইবরাহিম সামির আল-বিস।
গাজা, ফিলিস্তিন।
রামজি বারুদ সম্পাদিত 'দিস চেইনস উইল বি ব্রোকেন' বই থেকে।
***
ফিলিস্তিনি এই বন্দিনী ১৭ বছর বয়সে গ্রেপ্তার হন৷ ১২ বছরের সাজাপ্রাপ্ত এই কিশোরী ৬ বছর ইসরায়েলি কারাগারে বন্দি থাকার পর ২০১১ সালে বন্দি বিনিময় চুক্তিতে মুক্তি পান।
বর্তমানে জালিমের এই অন্ধকার কারাগারে নারী ও শিশুসহ প্রায় ১০ হাজার ফিলিস্তিনি বন্দি জীবন কাটাচ্ছেন। সম্প্রতি 'নেসেট' তাদের মৃত্যুদণ্ডের আইনও পাশ করেছে। বইটা পড়ার সময় এই দশ হাজার মানুষের প্রতিটি মুহূর্তের যন্ত্রণার কথা ভাবছিলাম।
মাঝে মাঝে মনে হয়, যুগের পর যুগ প্রতিদিন তিল তিল করে মেরে ফেলার চেয়ে একবারে মৃত্যু দেওয়া বোধহয় অনেক বেশি দয়ার কাজ। কিন্তু ওরা সেটা করবে না। কারণ ওরা জানে মৃত্যু নয়, বরং মৃত্যুবৎ যন্ত্রণাই আসল অস্ত্র। ওরা ভালো করেই জানে, একটি জীবন্ত মানুষকে কত উপায়ে যাতনা দিয়ে তবেই আজরাঈলের কাছে সোপর্দ করতে হয়।