22/08/2026
ফেসবুকে একটি ছোট শিশুর ভিডিও ঘুরছে যেখানে শিশুটি বিড়ালের মতো আচরণ করছে। বিড়ালের মতো শব্দ করা, মুখে হাত দিয়ে খামচানো, চুল ও মুখে বিড়ালের মত গ্রুমিং ইত্যাদি। পরিবার বলছে শিশুটিকে পোষা বিড়াল আঁচড় দিয়েছিল। তারা আরো বলেছে বিড়াল রেবিস টিকা দেওয়া ছিল ও শিশুকে পরবর্তীতে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা বা টিকা দেওয়া হয়েছে।
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি, শুধু একটি ভিডিও দেখে কোনো শিশুর রোগ নির্ণয় করা সম্ভব নয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এমন একটি অত্যন্ত বিরল সাইকিয়াট্রিক ফেনোমেনন আছে, জোয়ানথ্রোপি - (Zoanthropy)। সম্ভবত শিশুটির এই সমস্যা হয়েছে।
জোয়ানথ্রোপি এক ধরনের ডিলিউশন। এতে মানুষ নিজেকে কোনো নির্দিষ্ট প্রাণী হিসেবে বিশ্বাস করে ও সেই প্রাণীর মতো আচরণ করে। এই অসুখে কুকুর, বিড়াল, অথবা অন্য যে কোনো প্রাণীর মতো মানুষ আচরণ করতে পারে। কেউ যদি নিজেকে নেকড়ে মনে করে বা নেকড়ের মতো আচরণ করেন, বিশেষভাবে সেটাকে ক্লিনিক্যাল লাইক্যানথ্রোপি বলা হয়।
এসব কোনো “বিড়াল/কুকুরের রোগ” নয়। সাধারণত কোনো আন্ডারলাইং সাইকিয়াট্রিক ডিজঅর্ডার থেকে এটা হয়। সাইকোটিক ডিজঅর্ডার, মুড ডিজঅর্ডার উইদ সাইকোটিক ফিচারস এবং অন্যান্য মানসিক সমস্যার সঙ্গে এমন বিরল ফেনোমেনন দেখা যেতে পারে। প্রকৃত ডায়াগনসিস জানতে সরাসরি একজন শিশু ও কিশোর মনোরোগ বিশেষজ্ঞ দিয়ে শিশুটির এভ্যালুয়েশন করাতে হবে।
পোষা, ভ্যাকসিন দেওয়া, ইনডোর বিড়ালের আঁচড়ে রেবিস হওয়ার সুযোগ নাই। ভ্যাকসিন ছাড়া বাইরের বিড়ালের আঁচড়ে ঝুঁকি মনে হলে সঠিক চিকিৎসা ও রেবিস ভ্যাকসিন নেবেন। কিন্তু শিশুর বিড়ালের মতো আচরণ করা রেবিসের লক্ষণ নয়। বরং আঁচড়ের পর পরিবারের অতিরিক্ত উদ্বেগ, আশেপাশের মানুষের নানা কথা বলা বা ভয় দেখানো, এসব শিশুর মানসিক অবস্থা প্রভাবিত করতে পারে ও কোনো সাইকিয়াট্রিক সমস্যাকে ট্রিগার করতে পারে।
দুঃখজনক বিষয়, এই ঘটনা কেন্দ্র করে অনেকে প্রাণী প্রেমীদের বিদ্রূপ করছেন। পেট লাভাররা কই?, বিড়াল কুকুর দূরে রাখতে হবে, ইত্যাদি। একটি অসুস্থ শিশুকে কেন্দ্র করে এসব বিভেদ তৈরি করা বোকামি। ইতিমধ্যে এই ঘটনার পর অনেকে বিড়াল ফেলে দিচ্ছে, খাঁচায় আঁটকে রাখছে। যারা এই যুগে এসেও এসব বিশ্বাস করে, তাদের আসলে কোনো প্রাণীই পালা উচিত না।
প্রাণী থেকে মানুষের সংক্রমণ হতে পারে, কিন্তু সেটা হাতে গোনা কিছু অসুখ। রেবিস, ভ্যাকসিন দিলে হয় না। টক্সোপ্লাজমা, বিড়ালকে কাঁচা মাছ মাংস খেতে না দিলে হয় না। ক্রিমি, নিয়মিত ডিওয়ার্মিং করলে হয় না। আর কি হয়? মানুষ থেকে মানুষে এর থেকে অনেক বেশি অসুখ ছড়ায়। সেজন্য মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক কেউ ছাড়ে না; বরং সচেতনতা, হাইজিন, ভ্যাকসিন ও দরকারি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হয়।
এই শিশু নিয়ে হাসাহাসি বা আতঙ্ক ছড়ানো ঠিক নয়। এখন প্রয়োজন একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দেখিয়ে সঠিক ডায়াগনসিস করে চিকিৎসা দেওয়া, তাহলে ওর সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা আছে। এই সাইকিয়াট্রিক সমস্যা চিকিৎসাযোগ্য। মানসিক স্বাস্থ্য ইভালুয়েট করা জরুরি। মোবাইল সাংবাদিক দিয়ে ভিডিও করা, সেই ভিডিও লাইক কমেন্ট দিয়ে ভাইরাল করা, ভিউ পেতে রিপোস্ট করে ছড়ানো, ভিডিওর ব্যাখ্যা করে পাল্টা ভিডিও করা, এর কোনটাই প্রকৃতপক্ষে কোন সমাধান নয়। বরং এসব কাজ অন্য বিড়ালদের জীবন ঝুঁকিতে ফেলছে যাদের এখানে কোনো দোষ বা ভুমিকাই নেই।
আঁচড় কামড় খেয়ে ঘেউ মিউ করা কখনোই রেবিসের লক্ষন না। একটি ছেলেও কয়েক বছর ধরে কুকুরের আচরন নকল করে, চার হাত পায়ে হেঁটে, টাকা নিত। ওর চিকিৎসা হয়েছিল, পরে আর ওকে দেখা যায়নি। সবাই বলতো কুকুরের কামড়ে হয়েছে, যেন রেবিস হলে মানুষ বছরের পর বছর বেঁচে থাকে! সমস্যা হলো প্রাণী সম্পর্কিত যাই জনতা দেখে তাই রেবিস!
এও হতে পারে বাচ্চা ট্রমায় এই আচরন করছে। বড়রা অনেক সময় বাচ্চাদের প্যানিক করে দেয়। বিড়ালের নখ আছে, খেলতে গিয়ে আঁচড় লাগতে পারে, বিড়াল টিকা দেওয়া থাকলে এত কাহিনী, এত নিউজ দরকারী ছিল না। আরো ১০টা বিড়ালকে বিপদে ফেলা হচ্ছে। মূর্খ আর অন্ধের মত ২০২৬ সালে মানুষ এসব বিশ্বাস করলে কিছু বলার নাই। চাইলে গুগল/AI রিসার্চ করে রেবিস সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা যায় এসব ভুল তথ্য ছড়ানোর আগে। মানুষের একটা কিছু পেলেই হলো। ভিউ হলে টাকা পাওয়া যায়, তাই না! তাতে প্রাণিদের জীবনের ঝুঁকি থাকলেও সমস্যা কি!
মূল কথা, বাচ্চার মানসিক সমস্যা, নাহলে ইচ্ছা করে/ভয়ে এমন করছে। এই সুযোগে ভিউ ব্যবসা করতে বিভিন্ন চ্যানেল মনের মাধুরী মিশিয়ে এসব ছড়াচ্ছে। রেবিস আক্রান্ত মানুষ কখনো কুকুর বা বিড়ালের মত আচরণ করে না। রেবিস মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রে আক্রমণ করে তাই আচরণ ও চলাফেরায় পরিবর্তন হতে পারে। আক্রমণাত্মক, উত্তেজিত হয়ে পড়া, অতিরিক্ত লালা/থুতু পড়া, অস্থিরতা, পানি খেতে বা গিলতে ভয়/ কষ্ট হওয়া, খিঁচুনি বা পক্ষাঘাত ইত্যাদি। আক্রমণ করার প্রবণতা হতে পারে, কিন্তু কুকুর বিড়ালের মত ঘেউ ঘেউ মিউ মিউ, আচরণ করা, চার হাত পায়ে হাঁটা চলা, নিজেকে খামচি দেওয়া, এগুলো রেবিসের লক্ষণ না।
শরীরে অন্য প্রাণির কামড় ছাড়া নিজে থেকে বিড়াল রেবিসে আক্রান্ত হবে না। রেবিস ভাইরাস লালা দিয়ে শরীরে ব্লাডের মাধ্যমে যেতে হয়। বিড়ালের রেবিস হবে শুধু অন্য রেবিস আক্রান্ত প্রাণী কামড় দিলে, আক্রান্ত প্রাণীর লালা খোলা ক্ষত/কাটা জায়গায় লাগলে। অন্য প্রাণি দ্বারা বিড়াল আহত হলে তাকে রেবিস ভ্যাকসিন দিতে হয়। আর ভ্যাকসিন দেওয়া ঘরে পালা বিড়াল থেকে শিশুর রেবিস কিভাবে হয়, এগুলো রেবিসের কেমন লক্ষণ? এসব বানোয়াট রিউমার যারা ছড়াচ্ছে, এসব পোস্ট করে প্রাণিদের জীবন ঝুঁকিতে ফেলছে, এসব লেখা যারা বিশ্বাস করে বিড়াল মারছে, ফেলে দিচ্ছে, এই মূর্খরা যেন এর ফল এই জীবনে পায়।
অনেক তথ্য নিয়েছি গুলজার হোসেন উজ্জ্বল ভাইয়া থেকে। আর শুনতে পাচ্ছি বিড়ালটাকে ফেলে দেওয়া হয়েছে। কেউ বিড়ালটার কোনো খবর পেলে দয়া করে আমাদের জানাবেন।