অনুভবের ডায়েরি

অনুভবের ডায়েরি “প্রবন্ধে, গল্পে ও কবিতায় প্রাণী ও মানুষ — বিজ্ঞানের সুরে জীবনের অনুভব।”
(2)

"স্বাগতম 'অনুভবের ডায়েরি'-তে!

এটি শুধুমাত্র একটি ভেটেরিনারি পেজ নয়। আমি আপনাদের লেখক, যিনি তৃতীয় ব্যক্তি হিসেবে নিয়ে এসেছেন ডাঃ মিশুক দা-র জীবন, যিনি সাধারণ প্রাণী পালকদের কাছে সাক্ষাৎ ধনন্তরী।

আমার লক্ষ্য: গভীর ভেটেরিনারি বিজ্ঞানকে (আপডেটেড রিসার্চ) মানুষের দৈনন্দিন অনুভূতি ও জীবনের সাথে যুক্ত করা।

এখানে আপনি পাবেন:

গল্পের ছলে বৈজ্ঞানিক প্রশিক্ষণ (ডাঃ মিশুক দা-র গল্প)।

দীর্ঘ গবেষণামূলক প্রবন্ধ (বিশেষজ্ঞ আর্টিকেল)।

সহজ সরল ভাষায় ছন্দময় কবিতা।

বিজ্ঞান আর সাহিত্যের এই মিলনক্ষেত্রেই লুকিয়ে আছে পশু পালনের প্রকৃত শিক্ষা।"

🌹 অন্ধকারের সাক্ষী 🌹            পর্ব ২১মাথার ওপর ভারী বুটের খসখস শব্দ আর সার্চলাইটের কড়া আলো খাদের কিনারে এসে থমকে দাঁড়া...
22/08/2026

🌹 অন্ধকারের সাক্ষী 🌹

পর্ব ২১

মাথার ওপর ভারী বুটের খসখস শব্দ আর সার্চলাইটের কড়া আলো খাদের কিনারে এসে থমকে দাঁড়াল।

জুতোর আওয়াজটা এত কাছে যে রিয়ার মনে হলো, আর এক ইঞ্চি নড়লেই কেউ তাকে অন্ধকারের বুক থেকে টেনে বের করে নেবে। সে নিশ্বাস বন্ধ করে একটা পুরোনো মরচে পড়া পাইপের গায়ে আষ্টেপৃষ্ঠে সেঁটে রইল।

"এখানে কেউ নেই! শুধু ইঁদুরের উপদ্রব!" ওপর থেকে একজনের কর্কশ গলা ভেসে এল।

কিছুক্ষণ পর বুটের শব্দগুলো ধীরে ধীরে দূরে মিলিয়ে গেল।

রিয়া অন্ধকারে হাঁপাতে লাগল। তার বুকের ভেতরে তখন হাজারটা হাতুড়ি একসঙ্গে পেটাচ্ছে। কিছুক্ষণ আগে মেমোরি কার্ডের স্ক্রিনে শোনা সেই অডিও ফাইলটার কথাগুলো তার কানের ভেতর রিওয়াইন্ড হতে শুরু করেছে। নিজেরই গলার সেই ঠান্ডা, নির্লিপ্ত স্বর—"প্রজেক্ট সাইরেনের প্রথম ধাপ সফল হয়েছে... মানুষের মনকে ইচ্ছেমতো রিসেট করা সম্ভব..."

রিয়া নিজের দুই হাত নিজের চোখে বুলিয়ে ফিসফিস করে কাঁপতে লাগল, "আমি... আমি কি তবে কোনো নির্দোষ শিকার নই? আমি নিজেই এই দানবীয় গবেষণার পেছনে ছিলাম?"

কিন্তু পরক্ষণেই তার মনে প্রশ্ন জাগল—যদি সে-ই সবকিছুর স্রষ্টা হয়, তবে আজ তার নিজের স্মৃতিই বা মুছে ফেলা হলো কেন? কেন তার নিজের বাবা দেবব্রত রায় আর দেবদূত তাকে একটা পুতুলের মতো ব্যবহার করছে?

রিয়া মেমোরি কার্ডটা শক্ত করে মুঠোয় চেপে ধরল। জেনারেটরের ইউএসবি পোর্টের সংযোগটি তখনো বিচ্ছিন্ন হয়নি। ছোট্ট প্রজেকশন স্ক্রিনটার আলোয় সে দেখতে পেল, অডিও ফাইলের ঠিক নিচে আরও একটা ফোল্ডার ব্লিংক করছে—'ফাইনাল নোটস — ডক্টর অয়ন'।

রিয়ার বুকটা ছ্যাঁৎ করে উঠল। অয়ন!

সে আর এক মুহূর্তও দেরি না করে কাঁপতে কাঁপতে সেই ফোল্ডারটাতে টাচ করল।

স্ক্রিনে কোনো টেক্সট বা অডিও ভেসে উঠল না; বরং একটা ছোট ভিডিও ফাইল ওপেন হয়ে গেল।

ভিডিওটার ব্যাকগ্রাউন্ড দেখে বোঝা যাচ্ছে এটা কোনো ল্যাবরেটরি নয়, বরং অনেক বছর আগের একটা পাহাড়ি কেবিন। জানলার বাইরে বরফ পড়ছে।

ভিডিওর ফ্রেমে যার মুখটা ভেসে উঠল, তাকে দেখে রিয়ার গলা দিয়ে একটা অস্ফুট শব্দ বেরিয়ে এল—সেটা খোদ তরুণ বয়সের অয়ন! কিন্তু তার চেহারায় আজকের এই ক্লান্ত বা রহস্যময় অয়নের কোনো ছাপ নেই; বরং তার চোখে ছিল এক গভীর অপরাধবোধের ছায়া।

ভিডিওর ভেতর থেকে অয়নের সেই চেনা গম্ভীর গলা ভেসে এল—

"যদি তুমি এই ভিডিওটা দেখতে পাও, রিয়া, তার মানে বুঝব আমার এত বছরের পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়নি। তুমি হয়তো এখন ভাবছ তুমি অপরাধী, তুমি এই নরকের স্রষ্টা। কিন্তু বিশ্বাস করো, রিয়া... সত্যিটা সম্পূর্ণ আলাদা। ওরা তোমার মেমোরি শুধু ইরেজ করেনি, ওরা তোমার ভেতরে একটা মিথ্যা অতীত ইনজেক্ট করে দিয়েছে, যাতে তুমি নিজেকেই নিজের শত্রু বলে মনে করো।"

ভিডিওর অয়ন একটু থেমে কাঁচের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলল, তারপর আবার বলতে শুরু করল—

"প্রজেক্ট সাইরেন কোনো স্মৃতি মুছে ফেলার প্রজেক্ট ছিল না। ওটা ছিল মানুষের মস্তিষ্ক দখল করে একটা নিখুঁত পুতুল বানানোর চক্রান্ত। দেবব্রত রায় আর দেবদূত চেয়েছিল এই প্রযুক্তির মাধ্যমে পুরো সিস্টেমটাকে কন্ট্রোল করতে। আর তুমি... তুমি যখন তাদের এই ভয়ংকর ষড়যন্ত্রের কথা জেনে ফেলেছিলে, তখনই ওরা তোমার ওপর এই অপারেশন চালায়।

আমি শুধু তোমাকে বাঁচানোর জন্য একটা ব্যাকডোর তৈরি করেছিলাম... যেটার চাবিকাঠি এই মেমোরি কার্ড।"

রিয়ার চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ল কান্নার প্রথম ফোঁটা। ভিডিওতে অয়নের সেই দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে তার মনে হলো, অয়ন যেন সরাসরি তার চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলছে।

ভিডিওর শেষ লাইনে অয়ন অত্যন্ত শাণিত ও প্রতিজ্ঞার সুরে বলে উঠল—

"ওরা ভেবেছিল তোমার স্মৃতি মুছে দিলেই সব শেষ। কিন্তু ওরা জানে না, অন্ধকারের সাক্ষী হিসেবে আমি বেঁচে আছি। আর শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে হলেও আমি এই সত্য সবার সামনে নিয়ে আসব।"

ঠিক তখনই সুড়ঙ্গের অনেক দূর থেকে একটা বিকট বিস্ফোরণের শব্দ হলো—বোম!

পুরো টানেলটা একটা ভূমিকম্পের মতো কেঁপে উঠল। ছাদ থেকে ছোট ছোট পাথরের টুকরো রিয়ার গায়ে খসে পড়তে লাগল।

ভিডিওর স্ক্রিনটা নিভে যাওয়ার আগে অয়নের শেষ কথাগুলো প্রতিধ্বনিত হলো—

"এখন দৌড়াও, রিয়া! সুড়ঙ্গের শেষ মাথাতেই অপেক্ষা করছে আসল সত্য।"

রিয়া মেমোরি কার্ডটা পকেটে গুঁজে ফেলল। তার ভেতরের সমস্ত ভয় এখন একটা তীব্র জেদে রূপ নিয়েছে। সে আর পালিয়ে বেড়ানো কোনো ভীতু মেয়ে নয়—সে আজ প্রজেক্ট সাইরেনের সেই ধ্বংসস্তূপের মুখোমুখি দাঁড়াতে চলেছে।

চলবে…

🕔 আগামীকাল ঠিক বিকেল ৫টায় প্রকাশিত হবে "অন্ধকারের সাক্ষী"-এর পরবর্তী পর্ব। সঙ্গে থাকুন!

✍️ ডা. শ্রীহরি দেববর্মন

Copyright © কপিরাইট ২০২৬, অনুভবের ডায়েরি। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।

#অন্ধকারের_সাক্ষী #পর্ব_২২ #অনুভবের_ডায়েরি #সাইকোলজিক্যাল_থ্রিলার #ধারাবাহিক_উপন্যাস

22/08/2026

মুখোশধারী মানুষের ভিড়ে আসল আপনজনকে চিনে নিন। বিপদ যখন আসে, তখনই বোঝা যায় কে নিজের আর কে পর। আপনার জীবনে কি এমন কেউ আছে? ❤️

🌹 বিশ্বাসের ওপারে 🌹           পর্ব ১২🌹 পরম সত্তা যদি সব জানেন—তাহলে মানুষের ভবিষ্যৎ কি আগে থেকেই নির্ধারিত? 🌹 সেদিন সন্ধ...
21/08/2026

🌹 বিশ্বাসের ওপারে 🌹

পর্ব ১২

🌹 পরম সত্তা যদি সব জানেন—তাহলে মানুষের ভবিষ্যৎ কি আগে থেকেই নির্ধারিত? 🌹

সেদিন সন্ধ্যায় চারজন বসেছিল নদীর ধারে।

সূর্য ডুবে গেছে। নদীর জলে শেষ আলোটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে।

রাহুল হঠাৎ বলল,

— একটা কথা মাথায় ঘুরছে।

অয়ন বলল,

— বলো।

— যদি সত্যিই পরম সত্তা সব জানেন, তাহলে আমার ভবিষ্যতে কী হবে সেটাও তো তিনি এখনই জানেন।

— হ্যাঁ।

— তাহলে আমি যা করব, সেটা কি আগে থেকেই ঠিক হয়ে গেছে?

ড্যানিয়েল বলল,

— যদি তিনি সব জানেন, তাহলে তো তাই হওয়ার কথা।

আরিফ বলল,

— কিন্তু তাহলে আমাদের স্বাধীন ইচ্ছা কোথায়?

চারজনই চুপ হয়ে গেল।

প্রশ্নটা ছোট।

কিন্তু এর ভেতরে মানুষের স্বাধীনতা, দায়িত্ব, ভাগ্য, নৈতিকতা—সবকিছু যেন এসে দাঁড়াল।

অয়ন ধীরে বলল,

“আজকের প্রশ্নটা আসলে শুধু ভবিষ্যৎ নিয়ে নয়। আজকের প্রশ্ন—আমি কি সত্যিই নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নিই?”

---

সব জানা আর সব ঠিক করে দেওয়া কি একই?

অয়ন একটা সহজ উদাহরণ দিল।

— ধরো, তুমি কাল সকালে কী করবে, সেটা আমি কোনোভাবে নিশ্চিতভাবে জানি।

রাহুল বলল,

— কীভাবে জানবে?

— সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। ধরো, আমি জানি।

— ঠিক আছে।

— তাহলে আমার জানা কি তোমাকে কাল ওই কাজটা করতে বাধ্য করবে?

রাহুল একটু ভেবে বলল,

— না।

— কেন?

— কারণ তুমি জানছ বলে আমি করছি না। আমি নিজের কারণেই করছি।

অয়ন বলল,

— ঠিক এখানেই আজকের প্রথম পার্থক্য।

কোনো ঘটনা আগে থেকে জানা আর সেই ঘটনাকে ঘটতে বাধ্য করা—এক জিনিস নয়।

এই কথাটা খুব সহজ মনে হলেও এর মধ্যে গভীর দর্শন আছে।

---

একটা পরিচিত উদাহরণ

ধরুন, একজন অভিজ্ঞ চিকিৎসক বহু বছর ধরে রোগীদের দেখে বুঝতে পারেন যে কোনো রোগী কয়েক দিনের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট সমস্যায় পড়বেন।

তিনি বললেন—

“আমার অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, তোমার এমনটা হওয়ার সম্ভাবনা খুব বেশি।”

তার কথা শুনে রোগী কি বাধ্য হয়ে সেই সমস্যায় পড়বেন?

না।

চিকিৎসকের পূর্বাভাস রোগীর সিদ্ধান্তকে সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করে না।

অবশ্য এটা নিশ্চিত জ্ঞান নয়—শুধু পূর্বানুমান।

কিন্তু উদাহরণটি একটা পার্থক্য বোঝায়—

জানা বা অনুমান করা এবং ঘটনাকে ঘটানো এক নয়।

---

কিন্তু পরম সত্তার জ্ঞান যদি ভুল হতে না পারে?

এখানেই বিষয়টি আরও কঠিন।

একজন সাধারণ মানুষ ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অনুমান করেন।

তিনি ভুলও করতে পারেন।

কিন্তু যদি আমরা বলি—

পরম সত্তা সর্বজ্ঞ।

তাহলে তাঁর জ্ঞান ভুল হওয়ার কথা নয়।

ধরুন, পরম সত্তা আজই নিশ্চিতভাবে জানেন—

“রাহুল আগামীকাল দুপুরে একটি সিদ্ধান্ত নেবে।”

তাহলে আগামীকাল কি রাহুল অন্য সিদ্ধান্ত নিতে পারে?

যদি সে অন্য সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে তো পরম সত্তার পূর্বজ্ঞান ভুল হয়ে যাবে।

আর যদি তাঁর জ্ঞান ভুল হতে না পারে, তাহলে কি রাহুলের সামনে সত্যিই অন্য কোনো সম্ভাবনা খোলা ছিল?

এখানেই divine foreknowledge এবং free will-এর বিখ্যাত দার্শনিক সমস্যা সামনে আসে।

---

তাহলে কি ভবিষ্যৎ আগে থেকেই লেখা?

এখানে “জানা” এবং “লেখা”—এই দুটো শব্দ আলাদা করতে হবে।

ধরুন, একটি বইয়ের শেষ অধ্যায় আপনি পড়ে ফেলেছেন।

আপনি জানেন গল্পের শেষে কী হবে।

কিন্তু গল্পের চরিত্রগুলো কি সেই ঘটনা আপনার জানার কারণে ঘটিয়েছে?

না।

আপনার জানা ঘটনাটির কারণ নয়।

তবে এই উদাহরণের একটা সীমাবদ্ধতা আছে।

কারণ বইয়ের চরিত্ররা বাস্তব মানুষ নয়।

তারা লেখকের তৈরি।

মানুষের স্বাধীন ইচ্ছার সঙ্গে এই উদাহরণ পুরোপুরি মেলে না।

তবুও এটি একটা ধারণা বোঝাতে সাহায্য করে—

কোনো ঘটনার সত্যতা আগে থেকে জানা এবং সেই ঘটনার কারণ হওয়া এক বিষয় নয়।

---

কিন্তু আরও কঠিন প্রশ্ন আছে

অয়ন বলল,

— এবার ধরো, পরম সত্তা শুধু জানেন না। তিনি যখন জানেন, তখন তাঁর জ্ঞান একেবারে নির্ভুল।

রাহুল বলল,

— হ্যাঁ।

— তাহলে তুমি কি এমন কিছু করতে পারবে যা তিনি জানেন না?

— না।

— তাহলে?

রাহুল বলল,

— তাহলে যা তিনি জানেন, সেটাই আমাকে করতে হবে।

অয়ন বলল,

— এখানেই বিতর্ক।

কারণ একজন দার্শনিক বলতে পারেন—

“তুমি যা করবে, পরম সত্তা তা জানেন কারণ তুমি সেটাই স্বাধীনভাবে করবে।”

অন্যজন বলতে পারেন—

“কিন্তু যদি তাঁর জ্ঞান ভুল হওয়ার কোনো সম্ভাবনাই না থাকে, তাহলে তুমি অন্য কিছু করতে পারছ না।”

এই দ্বিতীয় অবস্থান থেকে মনে হতে পারে—

ভবিষ্যৎ যেন আগে থেকেই স্থির।

কিন্তু এখানেও “স্থির” কথাটার অর্থ পরিষ্কার করা দরকার।

---

নির্ধারিত আর জানা—একই নয়

ধরো, আগামীকাল সূর্য উঠবে।

আমরা জানি সূর্য ওঠার ব্যাপারে প্রকৃতির নিয়ম অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য।

কিন্তু সূর্য উঠবে বলে কি মানুষের সিদ্ধান্তও আগে থেকেই নির্ধারিত?

না।

একটি প্রাকৃতিক ঘটনার পূর্বনির্ধারিততা আর মানুষের সিদ্ধান্তের স্বাধীনতা একই বিষয় নয়।

ঠিক তেমনি—

পরম সত্তা ভবিষ্যৎ জানেন

এবং

পরম সত্তা ভবিষ্যতের প্রতিটি সিদ্ধান্ত জোর করে নির্ধারণ করেছেন

—এই দুটি বক্তব্যও একই নয়।

প্রথমটি জ্ঞানের কথা।

দ্বিতীয়টি কারণ বা নিয়ন্ত্রণের কথা।

---

তাহলে মানুষের স্বাধীন ইচ্ছা বলতে কী বোঝায়?

এই প্রশ্নটাও সহজ নয়।

আমরা সাধারণভাবে বলি—

“আমি নিজের ইচ্ছায় সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”

কিন্তু সেই সিদ্ধান্তের পেছনে কী ছিল?

আপনার চরিত্র।

আপনার অভিজ্ঞতা।

আপনার পরিবার।

আপনার শিক্ষা।

আপনার মস্তিষ্ক।

আপনার পরিবেশ।

আপনার বর্তমান আবেগ।

আপনার পূর্বের সিদ্ধান্ত।

এগুলো সবই আপনার সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে।

তাহলে প্রশ্ন—

আমাদের ইচ্ছা কতটা স্বাধীন?

আমরা কি একেবারে শূন্য থেকে সিদ্ধান্ত নিই?

নাকি আমাদের সিদ্ধান্তের পেছনে অসংখ্য পূর্ববর্তী কারণ কাজ করে?

এই প্রশ্ন ধর্মের বাইরেও দর্শন ও বিজ্ঞানে গুরুত্বপূর্ণ।

---

একটি ছোট গল্প

ড্যানিয়েল বলল,

— একটা ঘটনা বলি।

— বলো।

— ধরো, আমি বাজারে গেলাম। সামনে দুই দোকান।

একটায় মিষ্টি।

অন্যটায় ফল।

আমি কিছুক্ষণ ভাবলাম।

তারপর নিজের ইচ্ছায় ফল কিনলাম।

অয়ন বলল,

— ঠিক আছে।

— আমি কি স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিলাম?

— তোমার মনে হয়েছে তুমি স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছ।

— “মনে হয়েছে” কেন বলছ?

— কারণ প্রশ্ন হলো—তোমার সিদ্ধান্তের পেছনে কী ছিল?

ড্যানিয়েল বলল,

— আমি স্বাস্থ্যকর খাবার খেতে চেয়েছিলাম।

— কেন?

— কারণ আমি স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতন।

— কেন?

— পরিবারে ছোটবেলা থেকে সেটা শিখেছি।

— কেন?

ড্যানিয়েল হেসে বলল,

— তুমি তাহলে আমার জন্ম পর্যন্ত চলে যাবে!

অয়নও হাসল।

— ঠিক সেখানেই সমস্যা।

আমাদের প্রতিটি সিদ্ধান্তের পেছনে কারণ আছে।

তাহলে স্বাধীনতা মানে কি কারণহীন সিদ্ধান্ত?

নাকি—

নিজের ইচ্ছা, মূল্যবোধ ও বিবেচনার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা?

---

স্বাধীনতার দুটি ধারণা

এখানে দর্শনে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আসে।

এক ধরনের ধারণায় বলা হয়—

স্বাধীন হতে হলে একই পরিস্থিতিতে সত্যিই অন্য সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা থাকতে হবে।

অর্থাৎ আপনি চাইলে A অথবা B—দুটোর যেকোনোটি করতে পারতেন।

আরেকটি দৃষ্টিভঙ্গি হলো—

স্বাধীনতা মানে নিজের ইচ্ছা, কারণ ও মূল্যবোধ অনুযায়ী কাজ করা—এমনকি সেই ইচ্ছাগুলোরও পূর্ববর্তী কারণ থাকলেও।

এই দ্বিতীয় অবস্থানকে দর্শনে compatibilism-এর সঙ্গে যুক্ত করা হয়।

সহজ ভাষায়—

কারণ দ্বারা প্রভাবিত হওয়া এবং স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া সবসময় পরস্পরবিরোধী নয়।

এই বিতর্ক বহু পুরোনো এবং আজও শেষ হয়নি।

---

ধর্মীয় প্রশ্নটি তাহলে কোথায়?

ধর্মীয় চিন্তায় অনেক সময় বলা হয়—

মানুষকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।

ভালো ও মন্দের মধ্যে বেছে নেওয়ার সুযোগ আছে।

কাজের জন্য মানুষ দায়ী।

কিন্তু একই সঙ্গে পরম সত্তা ভবিষ্যৎ জানেন।

এখানেই প্রশ্ন—

যদি পরম সত্তা আগে থেকেই জানেন আমি কী করব, তাহলে আমার সিদ্ধান্তের জন্য আমি কতটা দায়ী?

একজন বিশ্বাসী বলতে পারেন—

“তিনি জানেন তুমি কী করবে, কিন্তু তিনি তোমাকে সেই কাজ করতে বাধ্য করেন না।”

একজন সংশয়বাদী প্রশ্ন করতে পারেন—

“কিন্তু তাঁর জ্ঞান যদি ভুল হওয়ার কোনো সম্ভাবনা না রাখে, তাহলে তুমি কি সত্যিই অন্য কিছু করতে পারতে?”

এটা খুব শক্তিশালী আপত্তি।

এবং এর সহজ, সর্বজনস্বীকৃত উত্তর নেই।

---

“ভাগ্য” আর “সর্বজ্ঞতা” কি একই?

না।

ভাগ্য বা fate বলতে অনেক সময় বোঝানো হয়—

যা হওয়ার তা হবেই; মানুষের চেষ্টা তা বদলাতে পারবে না।

এটা একটি শক্তিশালী নির্ধারণবাদী ধারণা।

কিন্তু পরম সত্তা সব জানেন—এটা নিজে থেকেই প্রমাণ করে না যে মানুষ কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারে না।

উদাহরণস্বরূপ, একজন বিশ্বাসী বলতে পারেন—

“পরম সত্তা জানেন আমি স্বাধীনভাবে কী সিদ্ধান্ত নেব।”

এখানে তাঁর জ্ঞান সিদ্ধান্তের কারণ নয়।

অন্যদিকে কেউ বলতে পারেন—

“যদি সেই সিদ্ধান্ত আগে থেকেই নির্ভুলভাবে সত্য হয়ে থাকে, তাহলে অন্য সিদ্ধান্তের বাস্তব সম্ভাবনা কোথায়?”

এই প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করে আমরা স্বাধীনতা বলতে কী বুঝছি তার ওপর।

---

ভবিষ্যৎ কি ইতিমধ্যেই বাস্তব?

এটা আরও গভীর প্রশ্ন।

আমরা অতীতকে জানি।

বর্তমানকে অনুভব করি।

কিন্তু ভবিষ্যৎ কি ইতিমধ্যেই কোনোভাবে “অস্তিত্বশীল”?

একটি দৃষ্টিভঙ্গি বলে—

ভবিষ্যতের ঘটনাগুলো কোনো অর্থে ইতিমধ্যেই বাস্তব।

আরেকটি দৃষ্টিভঙ্গি বলে—

ভবিষ্যৎ এখনো তৈরি হয়নি; সম্ভাবনার বিভিন্ন পথ খোলা আছে।

যদি দ্বিতীয়টি সত্য হয়, তাহলে প্রশ্ন দাঁড়ায়—

পরম সত্তা ভবিষ্যৎ কীভাবে জানেন?

আর যদি প্রথমটি সত্য হয়, তাহলে—

ভবিষ্যৎ যদি ইতিমধ্যেই বাস্তব হয়, মানুষের স্বাধীনতা কোথায়?

অর্থাৎ একটি প্রশ্নের উত্তর দিতে গেলে আরেকটি প্রশ্ন সামনে আসে।

---

“তিনি জানেন” মানেই “তিনি চান”—এটাও কি ঠিক?

না।

এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ।

ধরুন একজন শিক্ষক জানেন যে তাঁর ছাত্র পরীক্ষায় ফেল করবে।

তিনি ছাত্রকে ফেল করাতে চান—এটা তার থেকে প্রমাণ হয় না।

তিনি শুধু জানেন।

একইভাবে, কোনো পরম সত্তা যদি ভবিষ্যৎ জানেন বলে ধরে নিই, তাঁর জানা এবং তাঁর ইচ্ছা—দুটি আলাদা বিষয়।

কেউ হয়তো এমন কিছু করবে যা পরম সত্তা পছন্দ করেন না—তবু তিনি আগে থেকেই জানতেন যে সে তা করবে।

তাই—

পূর্বজ্ঞান = অনুমোদন নয়।

এবং—

জানা = ঘটানোও নয়।

---

কিন্তু যদি তিনি সবকিছু নিয়ন্ত্রণও করেন?

তাহলে প্রশ্নটা আরও কঠিন।

যদি বলা হয়—

“পরম সত্তা শুধু সব জানেন না, তিনি মহাবিশ্বের প্রতিটি ঘটনাও নিজের ইচ্ছায় নির্ধারণ করেন।”

তাহলে মানুষের স্বাধীন ইচ্ছা নিয়ে সমস্যা আরও তীব্র হয়।

কারণ তখন প্রশ্ন হবে—

আমি যদি অন্যায় করি, সেটা কি সত্যিই আমার সিদ্ধান্ত?

নাকি সেই সিদ্ধান্তও আগে থেকেই নির্ধারিত?

আর যদি আমার সিদ্ধান্ত আগে থেকেই নির্ধারিত হয়, তাহলে আমাকে নৈতিকভাবে দায়ী করা কতটা ন্যায়সঙ্গত?

এই প্রশ্ন ধর্মীয় দর্শনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

---

তাহলে কি স্বাধীনতা পুরোপুরি অসম্ভব?

আবারও—এত তাড়াতাড়ি সিদ্ধান্তে যাওয়া ঠিক নয়।

স্বাধীনতার অর্থ যদি হয়—

“কোনো কারণ ছাড়াই সিদ্ধান্ত নেওয়া,”

তাহলে হয়তো স্বাধীনতা ধারণাটিই সমস্যায় পড়ে।

কারণ কারণহীন সিদ্ধান্তকে আমরা কীভাবে নিজের সিদ্ধান্ত বলব?

কিন্তু স্বাধীনতার অর্থ যদি হয়—

“নিজের বিবেচনা, ইচ্ছা ও মূল্যবোধ অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া,”

তাহলে কেউ বলতে পারেন যে মানুষের স্বাধীনতা এবং পরম সত্তার পূর্বজ্ঞান পাশাপাশি থাকতে পারে।

এখানেই compatibilist অবস্থানটি আসে।

অন্যদিকে libertarian free will-এর কিছু দার্শনিক ধারণা মনে করে, সত্যিকারের স্বাধীনতার জন্য কিছু অর্থে বিকল্প সম্ভাবনা থাকা দরকার।

তাই বিতর্কটা আসলে—

“স্বাধীনতা কী?”

এই প্রশ্নের ওপরও দাঁড়িয়ে আছে।

---

একটা অদ্ভুত প্রশ্ন

রাহুল বলল,

— ধরো, পরম সত্তা জানেন আমি আগামীকাল কী করব।

আমি যদি ইচ্ছা করে অন্য কিছু করি?

অয়ন বলল,

— তাহলে তাঁর জ্ঞান ভুল হবে।

— তাহলে আমি কি সেটা করতে পারি?

— এই প্রশ্নটাই বিতর্কের কেন্দ্র।

রাহুল বলল,

— তাহলে তো মনে হচ্ছে আমি পারি না।

অয়ন বলল,

— কিন্তু “তুমি পারো না” কথাটার অর্থও দুই রকম হতে পারে।

— কীভাবে?

— প্রথম অর্থ: তোমার ওপর কেউ জোর করে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে।

দ্বিতীয় অর্থ: তুমি বাস্তবে অন্য কিছু করবে না, কারণ তুমি যা করবে সেটাই সত্য হয়ে থাকবে।

দুটো এক নয়।

রাহুল বলল,

— মাথা ঘুরছে।

ড্যানিয়েল হেসে বলল,

— এই কারণেই দর্শন পড়লে চা ঠান্ডা হয়ে যায়।

চারজন হেসে উঠল।

---

তাহলে কি সবকিছু আগে থেকেই লেখা?

আজকের আলোচনার ভিত্তিতে সরাসরি “হ্যাঁ” বলা যাবে না।

কারণ—

পরম সত্তা ভবিষ্যৎ জানেন

পরম সত্তা ভবিষ্যৎকে জোর করে নির্ধারণ করেছেন।

আবার—

মানুষ স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেয়

পরম সত্তা ভবিষ্যৎ জানেন না।

দুটোকে কীভাবে একসঙ্গে বোঝানো যায়—সেটাই মূল দার্শনিক সমস্যা।

বিভিন্ন ধর্মীয় ও দার্শনিক ঐতিহ্য এর বিভিন্ন উত্তর দিয়েছে।

কেউ ঈশ্বরীয় পূর্বজ্ঞান ও স্বাধীন ইচ্ছার মধ্যে সামঞ্জস্য দেখেছেন।

কেউ মানুষের স্বাধীনতাকে অন্যভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন।

কেউ মনে করেছেন ভবিষ্যৎ সম্পর্কে পরম সত্তার জ্ঞানকে আমরা মানুষের সময়ের ধারণা দিয়ে পুরোপুরি বুঝতে পারি না।

আবার কেউ মনে করেছেন সর্বজ্ঞতা ও শক্তিশালী স্বাধীন ইচ্ছার মধ্যে গভীর টানাপোড়েন আছে।

অর্থাৎ—

একটি উত্তর নেই।

---

আর এখানেই একটা বড় শিক্ষা

আমরা যখন বলি—

“আমি স্বাধীন।”

তখন আগে জিজ্ঞেস করা দরকার—

স্বাধীন বলতে কী বোঝাচ্ছি?

যখন বলি—

“পরম সত্তা সব জানেন।”

তখন জিজ্ঞেস করতে হবে—

সব জানা বলতে কী বোঝাচ্ছি?

যখন বলি—

“ভবিষ্যৎ নির্ধারিত।”

তখন জিজ্ঞেস করতে হবে—

নির্ধারিত মানে কী?

আর যখন বলি—

“ভাগ্য।”

তখন জিজ্ঞেস করতে হবে—

ভাগ্য কি কারণ-নির্ধারিত ভবিষ্যৎ, নাকি কোনো অতিপ্রাকৃত পরিকল্পনা?

শব্দগুলো পরিষ্কার না করলে বিতর্ক শুধু শব্দের মধ্যে ঘুরপাক খাবে।

---

শেষের আগে একটি ছোট দৃশ্য

রাত হয়ে গেছে।

নদীর জলে চাঁদের আলো পড়েছে।

রাহুল বলল,

— একটা কথা আজ বুঝলাম।

অয়ন তাকাল।

— কী?

— ভবিষ্যৎ নিয়ে আমরা যতটা নিশ্চিতভাবে কথা বলি, আসলে ততটা নিশ্চিত নই।

ড্যানিয়েল বলল,

— আর নিজের স্বাধীনতা নিয়েও।

আরিফ বলল,

— কিন্তু একটা জিনিস তো আমি জানি।

— কী?

— আমি এখন তোমাদের সঙ্গে বসে কথা বলছি। এই সিদ্ধান্তটা আমি নিজের ইচ্ছায় নিয়েছি।

অয়ন হাসল।

— তুমি তাই মনে করছ।

আরিফ বলল,

— আবার শুরু করলে?

সবাই হেসে উঠল।

অয়ন বলল,

— না। শুধু একটা কথা মনে করিয়ে দিলাম।

তারপর সে বলল,

“হয়তো স্বাধীনতার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো—আমরা প্রশ্ন করতে পারি। আর সেই প্রশ্নের উত্তর কী হবে, সেটাও আমরা নিজেরাই খুঁজতে পারি।”

রাহুল নদীর দিকে তাকিয়ে রইল।

হয়তো তার ভবিষ্যৎ কোথাও লেখা আছে।

হয়তো নেই।

হয়তো কোনো পরম সত্তা তা জানেন।

হয়তো মানুষের সময়ের ধারণা দিয়ে সেই জ্ঞান বোঝাই যায় না।

কিন্তু একটা বিষয় নিশ্চিত—

ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন করার ক্ষমতা মানুষের আছে।

আর সেই প্রশ্ন থেকেই শুরু হয় অনুসন্ধান।

---

আজকের আলোচনার সারকথা

পরম সত্তা সব জানেন—এই ধারণা সত্য ধরে নিলেও সেখান থেকে সরাসরি “মানুষের কোনো স্বাধীনতা নেই” প্রমাণ হয় না।

কারণ—

জানা আর ঘটানো এক নয়।

পূর্বজ্ঞান আর নির্ধারণ এক নয়।

কারণ দ্বারা প্রভাবিত হওয়া আর সম্পূর্ণভাবে বাধ্য হওয়া এক নয়।

তবে একটি কঠিন প্রশ্ন থেকেই যায়—

যদি ভবিষ্যৎ সম্পর্কে পরম সত্তার জ্ঞান একেবারে নির্ভুল হয়, তাহলে মানুষ কি সত্যিই অন্যভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা রাখে?

এই প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করে আমরা—

“জ্ঞান”, “স্বাধীনতা” এবং “নির্ধারণ”—এই তিনটি শব্দকে কীভাবে সংজ্ঞায়িত করছি তার ওপর।

তাই আজ আমরা কোনো পক্ষকে জিতিয়ে দেব না।

শুধু প্রশ্নটাকে পরিষ্কার করব।

কারণ কখনো কখনো—

সঠিক প্রশ্ন পাওয়াই সঠিক উত্তরের দিকে প্রথম বড় পদক্ষেপ।

---

আজকের প্রশ্ন

আপনার কী মনে হয়?

পরম সত্তা যদি মানুষের ভবিষ্যৎ আগে থেকেই জানেন, তাহলে মানুষ কি সত্যিই স্বাধীন?

নাকি—

তিনি শুধু জানেন মানুষ কী সিদ্ধান্ত নেবে, কিন্তু সিদ্ধান্তটি মানুষই নিজের ইচ্ছায় নেয়?

আর একটি প্রশ্ন—

ভবিষ্যৎ যদি আগে থেকেই জানা থাকে, তাহলে “আমি অন্য কিছু করতে পারতাম”—এই কথাটার অর্থ কী?

আপনার যুক্তি কী?

আপনার মতামত জানাতে কমেন্ট করুন।

ভিন্ন বিশ্বাসকে আঘাত নয়—

প্রশ্নটাকে আরও গভীরভাবে বোঝাই আমাদের উদ্দেশ্য।

— অনুভবের ডায়েরি

পরম সত্তা যদি ভবিষ্যৎ জানেন, তাহলে মানুষের স্বাধীন ইচ্ছা কি সত্যিই স্বাধীন? আপনার মতামত জানাতে কমেন্ট করুন।

Copyright © ২০২৬ অনুভবের ডায়েরি — সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।

#বিশ্বাসেরওপারে #যুক্তিরআলোচনা #ধর্মীয়বিশ্বাস #অনুভবেরডায়েরি

🌹 ডিজিটাল জানালা 🌹          পর্ব ২১       BLOCKরাত তখন প্রায় এগারোটা।ঈশিতা বিছানায় বসে Facebook দেখছিল।হঠাৎ একটা Comme...
21/08/2026

🌹 ডিজিটাল জানালা 🌹

পর্ব ২১

BLOCK

রাত তখন প্রায় এগারোটা।

ঈশিতা বিছানায় বসে Facebook দেখছিল।

হঠাৎ একটা Comment চোখে পড়ল।

একজন অচেনা মানুষ তার একটা পোস্টের নিচে লিখেছে—

“আপনাকে দেখে তো খুব ভদ্র মনে হয়েছিল। আসল চেহারা এখন বুঝলাম!”

ঈশিতা প্রথমে পাত্তা দিল না।

ভাবল, হয়তো কোনো ভুল বোঝাবুঝি।

কিন্তু কয়েক মিনিট পর আরেকটা Comment।

তারপর আরেকটা।

তারপর Messenger-এ একটা Message।

“আপনার সঙ্গে একটু কথা বলতে চাই।”

ঈশিতা উত্তর দিল না।

কিছুক্ষণ পর আবার Message।

“উত্তর দিচ্ছেন না কেন?”

তারপর—

“আপনাকে আমি চিনি।”

ঈশিতার ভ্রু কুঁচকে গেল।

লোকটাকে সে চেনে না।

তবু তার কথার মধ্যে এমন একটা ভঙ্গি, যেন বহুদিনের পরিচয়।

সে Profile খুলে দেখল।

অচেনা মানুষ।

কোনো Mutual Friend নেই।

কিছু অদ্ভুত পোস্ট।

কয়েকটা অস্পষ্ট ছবি।

ঈশিতা ফোনটা নামিয়ে রাখল।

কিন্তু বিষয়টা সেখানেই থামল না।

পরদিন সকালে তার একটা নতুন পোস্টে আবার সেই মানুষটির Comment।

এইবার ভাষাটা আরও কটু।

ঈশিতা রেগে গেল।

সে Reply দিতে গিয়েও থেমে গেল।

মনে হলো—

“আমি কেন একজন অচেনা মানুষের সঙ্গে সারাদিন তর্ক করব?”

সে Comment-টা মুছে দিল।

কিন্তু কিছুক্ষণ পর আবার Comment।

আবার Reply।

আবার Message।

তারপর একটা Friend Request।

ঈশিতা Request Delete করল।

কয়েক মিনিট পর আবার Request।

সে তখন তার বন্ধু সায়নকে ফোন করল।

— “একটা মানুষ আমাকে খুব বিরক্ত করছে।”

— “Block করে দাও।”

ঈশিতা একটু চুপ করে বলল,

— “Block?”

— “হ্যাঁ।”

— “এটা কি খুব কঠিন কোনো ব্যাপার?”

সায়ন হেসে বলল,

— “না। কিন্তু তুই যে এতক্ষণ ধরে ভাবছিস, তাতেই বোঝা যাচ্ছে তুই Block-কে একটু অন্যভাবে দেখিস।”

— “কীভাবে?”

— “তোর মনে হচ্ছে Block করা মানে কাউকে অপমান করা।”

ঈশিতা চুপ করে গেল।

সায়ন বলল,

— “সব সময় তা নয়।”

---

ঈশিতা বলল,

— “তাহলে Block আসলে কী?”

সায়ন বলল,

— “সহজভাবে বললে, Block হলো ডিজিটাল সীমারেখা।”

— “মানে?”

— “ধর, তুই কারও সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে চাইছিস না। সে বারবার তোর Profile, Message বা অন্যান্য উপায়ে তোর কাছে পৌঁছাতে চাইছে। তখন Facebook-এর Block feature ব্যবহার করে তাকে তোর সঙ্গে যোগাযোগ বা তোর Profile-এ পৌঁছানোর সুযোগ সীমিত করা যায়—ফিচারের বর্তমান আচরণ অনুযায়ী।”

“আর একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, Block আর Unfriend এক জিনিস নয়।”

ঈশিতা বলল,

— “কীভাবে?”

— “Unfriend করলে শুধু Friend connection ভেঙে যায়। কিন্তু Block অনেক বেশি শক্তিশালী সীমা তৈরি করে।”

“আবার Mute বা Unfollow-ও আলাদা।”

— “মানে?”

— “তুই যদি কারও পোস্ট দেখতে না চাস, কিন্তু তার সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে আপত্তি না থাকে, তখন Unfollow বা Mute ধরনের ব্যবস্থা যথেষ্ট হতে পারে।”

ঈশিতা এবার বুঝতে শুরু করল।

সব সমস্যার সমাধান Block নয়।

আবার কিছু সমস্যায় Block-ই যথাযথ সীমারেখা হতে পারে।

---

সেদিন রাতে ঈশিতা নিজের Facebook-এর বিভিন্ন অপশন নিয়ে ভাবল।

তার জীবনে এমন মানুষও আছে, যাদের সঙ্গে সে যোগাযোগ রাখতে চায় না।

কিন্তু তারা খারাপ মানুষ নয়।

শুধু তাদের পোস্ট দেখতে ভালো লাগে না।

তাহলে কি তাদের সবাইকে Block করবে?

না।

কারও পোস্ট না দেখতে চাইলে Unfollow করা যায়।

কাউকে Friend List থেকে সরাতে হলে Unfriend করা যায়।

কাউকে নির্দিষ্টভাবে সীমিত রাখতে অন্য Privacy বা audience controls কাজে লাগতে পারে।

আর কেউ যদি বারবার বিরক্ত করে, অনাকাঙ্ক্ষিত যোগাযোগ করে, হয়রানি করে বা নিরাপত্তার সমস্যা তৈরি করে—

তখন Block-এর কথা ভাবা যায়।

ঈশিতা বুঝল—

Block কোনো রাগের অস্ত্র নয়।

এটা একটা boundary tool।

---

পরদিন অফিসে লাঞ্চের সময় সহকর্মী মধুমিতা বলল,

— “তুই Block করতে এত ভাবছিস কেন?”

ঈশিতা ঘটনাটা বলল।

মধুমিতা বলল,

— “আমি একবার একজনকে Block করেছিলাম।”

— “কেন?”

— “প্রতিদিন আমার পোস্টে এসে অদ্ভুত মন্তব্য করত।”

— “তুই Reply দিতিস?”

— “প্রথমে দিতাম।”

— “তারপর?”

— “একদিন বুঝলাম, আমি তার সঙ্গে কথা বলার জন্য Facebook খুলছি না।”

ঈশিতা হেসে ফেলল।

মধুমিতা বলল,

— “সেদিন Block করলাম।”

— “তারপর?”

— “শান্তি।”

একটা শব্দ।

শান্তি।

ঈশিতার মনে হলো, কখনও কখনও মানুষ Block-কে অহংকার ভাবে।

কিন্তু আসলে সেটা নিজের মানসিক শান্তির জন্য একটা সীমা হতে পারে।

---

সন্ধ্যায় ঈশিতা আবার সেই ব্যক্তির Profile খুলল।

তারপর কিছুক্ষণ ভাবল।

লোকটা তাকে অপমান করেছে।

বারবার যোগাযোগ করেছে।

বারবার নতুন করে Comment করেছে।

সে আগে Reply দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করেছে।

কাজ হয়নি।

এবার সে সিদ্ধান্ত নিল—

তর্ক নয়।

প্রতিশোধ নয়।

কোনো পাল্টা অপমান নয়।

সে Block করল।

তারপর ফোনটা রেখে দিল।

দশ মিনিট।

কুড়ি মিনিট।

এক ঘণ্টা।

কোনো Message নেই।

কোনো Comment নেই।

কোনো অস্বস্তি নেই।

ঈশিতা মৃদু হাসল।

সায়নকে ফোন করে বলল,

— “হয়ে গেছে।”

— “কী?”

— “Block।”

সায়ন বলল,

— “এখন কেমন লাগছে?”

ঈশিতা বলল,

— “মনে হচ্ছে নিজের ঘরের দরজাটা একটু বন্ধ করলাম।”

সায়ন বলল,

— “এই তো।”

---

কিন্তু কয়েকদিন পর ঈশিতার আরেকটা সমস্যা হলো।

তার এক পরিচিত মানুষ তাকে বলল—

— “তুমি আমাকে Block করেছ?”

ঈশিতা অবাক।

— “আপনি জানলেন কীভাবে?”

লোকটি বলল,

— “আপনার Profile দেখতে পাচ্ছি না।”

ঈশিতা তখন বুঝল—

Block করা বিষয়টি সব সময় অদৃশ্য থাকে না।

মানুষ পরিস্থিতি দেখে আন্দাজ করতে পারে।

তাই কাউকে Block করার পর সেই মানুষ কী ভাবল, সেটা নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা করারও দরকার নেই।

কারণ Block করার উদ্দেশ্য—

অন্য মানুষকে শিক্ষা দেওয়া নয়।

নিজের সীমা নির্ধারণ করা।

---

একদিন ঈশিতার ছোট ভাই রিদয় জিজ্ঞেস করল,

— “দিদি, কেউ আমাকে Friend Request পাঠিয়েছে। আমি তাকে চিনি না। Accept করব?”

ঈশিতা বলল,

— “কেন Accept করতে চাইছিস?”

— “Mutual Friend আছে।”

— “তাকে চেনিস?”

— “না।”

— “তাহলে শুধু Mutual Friend আছে বলে Accept করার দরকার কী?”

রিদয় চুপ করে গেল।

ঈশিতা বলল,

— “Facebook-এ পরিচিত মানুষের পরিচিত মানেই পরিচিত মানুষ নয়।”

“কাউকে না চিনলে Request Accept করতেই হবে—এমন কোনো নিয়ম নেই।”

“আর Accept করার পর সমস্যা হলে Block করার সুযোগ আছে।”

রিদয় বলল,

— “মানে আগে সাবধান, পরে Block?”

ঈশিতা হেসে বলল,

— “সব সময় Block-কে প্রথম সমাধান বানানোর দরকার নেই। কিন্তু প্রয়োজন হলে ব্যবহার করতে ভয়ও পাওয়ার দরকার নেই।”

---

কয়েক মাস পর ঈশিতার Facebook-এ একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটল।

একজন পুরোনো পরিচিত তার পোস্টে এসে বারবার তর্ক করছে।

কিন্তু সে গালাগালি করছে না।

হয়রানিও করছে না।

শুধু তার রাজনৈতিক মতামত ঈশিতার পছন্দ হচ্ছে না।

ঈশিতা প্রথমে ভাবল—

“এবার Block করে দিই।”

তারপর থামল।

সে নিজেকে প্রশ্ন করল—

“এই মানুষটা কি সত্যিই আমার নিরাপত্তার সমস্যা তৈরি করছে?”

উত্তর—

না।

সে শুধু ভিন্ন মত পোষণ করছে।

ঈশিতা বুঝল—

ভিন্ন মত মানেই Block করার কারণ নয়।

কেউ আপনার সঙ্গে একমত নয় বলে তাকে ডিজিটাল পৃথিবী থেকে মুছে দিতে হবে—এমন নয়।

Block-এর মতো শক্তিশালী সীমা তখনই বেশি অর্থপূর্ণ, যখন সত্যিই তার প্রয়োজন আছে।

সে এবার Block করল না।

প্রয়োজনে সেই ব্যক্তির পোস্ট না দেখার জন্য Unfollow-এর পথ বেছে নিল।

তর্কও করল না।

শান্ত থাকল।

---

এই ঘটনার কয়েকদিন পর সায়ন বলল,

— “তুই এখন Block-এর ব্যাপারটা বুঝেছিস।”

ঈশিতা বলল,

— “হ্যাঁ।”

— “কী বুঝেছিস?”

ঈশিতা বলল,

— “আগে ভাবতাম Block মানে কাউকে শাস্তি দেওয়া।”

“এখন বুঝেছি, Block মানে অনেক সময় নিজের সীমা রক্ষা করা।”

সায়ন বলল,

— “আর?”

— “কিন্তু সবাইকে Block করাও সমাধান নয়।”

— “কেন?”

— “কারণ কেউ আমাকে বিরক্ত করছে না, শুধু তার পোস্ট আমার ভালো লাগে না—তাহলে Unfollow যথেষ্ট হতে পারে।”

“কেউ Friend List-এ আছে কিন্তু সম্পর্ক রাখতে চাই না—তাহলে Unfriend হতে পারে।”

“কেউ নির্দিষ্ট কিছু বিষয় থেকে সীমিত রাখা দরকার—তাহলে Privacy বা audience control দেখতে হবে।”

“আর কেউ যদি বারবার যোগাযোগ করে, হয়রানি করে বা আমি তার সঙ্গে কোনো যোগাযোগই রাখতে না চাই—তখন Block।”

সায়ন মুচকি হাসল।

— “এবার ঠিক বলেছিস।”

---

ঈশিতা নিজের ফোনের দিকে তাকাল।

তার Facebook-এ এখন অনেক মানুষ।

সবাই তার বন্ধু নয়।

সবাই তার সঙ্গে একমত নয়।

সবাই তার পছন্দের মানুষও নয়।

কিন্তু সে একটা বিষয় শিখেছে—

ডিজিটাল সম্পর্কেও সীমারেখা দরকার।

বাস্তব জীবনে কেউ যদি আপনার বাড়িতে এসে বারবার বিরক্ত করে, আপনি দরজা বন্ধ করতে পারেন।

কেউ যদি শুধু আপনার কথা পছন্দ না করে, তাই বলে তার মুখে দরজা বন্ধ করে দেওয়া ঠিক নয়।

আবার কেউ যদি আপনার সীমা বারবার অতিক্রম করে—

তখন দরজা বন্ধ করার অধিকার আপনার আছে।

Facebook-এর Block feature সেই ডিজিটাল দরজার মতো।

এটা কোনো প্রতিশোধ নয়।

এটা কোনো ঘোষণা নয়—

“আমি তোমার চেয়ে বড়।”

বরং অনেক সময় খুব শান্ত একটা সিদ্ধান্ত—

“আমি আর এই যোগাযোগটা চাই না।”

---

রাত তখন আবার গভীর।

ঈশিতা নিজের Profile খুলল।

তারপর একটা পোস্ট পড়ল।

কেউ একজন লিখেছে—

“সব সম্পর্ক ধরে রাখতে হয় না। কিছু সম্পর্ক থেকে দূরত্ব রাখাটাও নিজের প্রতি সম্মান।”

ঈশিতা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর ফোনটা বন্ধ করল।

সে জানে—

কাউকে Block করা মানে তার জীবন থেকে মানুষটাকে মুছে ফেলা নয়।

মানুষ বাস্তব জীবনে নিজের মতোই থাকবে।

কিন্তু নিজের ডিজিটাল জগতে—

কাকে কতটা জায়গা দেব, সেটা তার নিজের সিদ্ধান্ত।

আর সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারটুকু থাকা দরকার।

কারণ Facebook-এর Timeline যতই বড় হোক,

মানুষের ব্যক্তিগত সীমারেখা তার চেয়েও বড়।

ঈশিতা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে শেষবার ফোনটার দিকে তাকাল।

তারপর নিজের মনে বলল—

“সবাইকে দরজা খুলে দিতে হয় না।

কেউ অতিথি, কেউ পরিচিত, কেউ শুধু পথের মানুষ।

আর কেউ যদি বারবার সীমা ভাঙে—

দরজা বন্ধ করাও কখনও কখনও ভুল নয়।”

ঘর অন্ধকার হয়ে গেল।

ফোনের স্ক্রিনও নিভে গেল।

কিন্তু ঈশিতা জানে—

তার ডিজিটাল দরজার চাবিটা অন্তত তার নিজের হাতেই আছে।

— সমাপ্ত।

— অনুভবের ডায়েরি

Copyright © ২০২৬ অনুভবের ডায়েরি। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।

আপনার কাছে Block কি রাগের সিদ্ধান্ত, নাকি নিজের সীমারেখা রক্ষার একটি উপায়?

আপনার মতামত মন্তব্যে জানিয়ে যান।

#ডিজিটাল_জানালা



#অনুভবের_ডায়েরি

🌹 অন্ধকারের সাক্ষী 🌹         পর্ব ২০গোলাগুলির প্রচণ্ড আওয়াজ আর ধোঁয়াশার মধ্যে চারপাশটা কেমন যেন থমকে গেছে। টানেলের সেই স...
21/08/2026

🌹 অন্ধকারের সাক্ষী 🌹

পর্ব ২০

গোলাগুলির প্রচণ্ড আওয়াজ আর ধোঁয়াশার মধ্যে চারপাশটা কেমন যেন থমকে গেছে। টানেলের সেই সংকীর্ণ খাদের গভীরে পড়ার সময় রিয়ার হাতের কনুইটা পাথরের দেওয়ালে সজোরে ধাক্কা খেল। তীব্র ব্যথায় তার মুখ দিয়ে একটা আর্তনাদ বেরিয়ে আসার উপক্রম হলেও সে দুই হাত দিয়ে মুখ চেপে ধরে কোনোমতে নিজেকে সামলে নিল।

কান ফাটানো গুলির শব্দের মাঝেও রিয়ার কানের ভেতর তখন কেবল বেজে চলেছে অয়নের সেই শেষ কথাটা—

*"স্মৃতি মুছে ফেলা যায়, রিয়া... কিন্তু সত্য কখনো মরে না!"*

অয়ন কি তবে জেনেশুনেই নিজেকে ওই গুলির মুখে বলি দিয়ে দিল? কেন সে এমন একটা বিদায়ের দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়েছিল?

রিয়া হামাগুড়ি দিয়ে খাদের আরও গভীরে একটা পুরোনো লোহার পাইপের আড়ালে লুকিয়ে পড়ল। মাথার ওপর ভারী বুটের খসখস শব্দ আর লোকগুলোর কথাবার্তা আবছা ভেসে আসছে।

দেবদূতের ঠান্ডা গলাটা সুড়ঙ্গের ছাদ চিরে প্রতিধ্বনিত হলো, "চারপাশটা ভালো করে ঘিরে ফেলো! ওই মেমোরি কার্ডটা যেভাবেই হোক উদ্ধার করতে হবে। অয়ন একা বেশিক্ষণ টিকতে পারবে না!"

গোলাগুলির শব্দ একটু কমতেই রিয়া খেয়াল করল, তার মুঠোয় শক্ত করে ধরে রাখা সেই ছোট কালো মেমোরি কার্ডটা তার ঘামে ভেজা হাতের তালুতে পুরোপুরি উষ্ণ হয়ে গেছে। অয়ন মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়েও এই কার্ডটাই তার হাতে তুলে দিয়েছে। এর ভেতরে এমন কী আছে, যা এই মানুষগুলো এত মরিয়া হয়ে খুঁজছে?

রিয়া আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা করল না। সে পকেট থেকে তার ছোট মেটালিক ফ্ল্যাশলাইটটা বের করে আলোটা খুব সাবধানে জ্বেলে ফেলল। ফ্ল্যাশলাইটের ক্ষীণ আলোয় সে মেমোরি কার্ডটার পেছনের ছোট মাইক্রো-স্লটটার দিকে তাকিয়ে বুঝল, এটা পড়ার জন্য কোনো বিশেষ ডিভাইস বা ল্যাপটপের প্রয়োজন নেই—এর সঙ্গে একটা মিনি পোর্টেবল ডিসপ্লে পিন যুক্ত রয়েছে।

রিয়া কাঁপাকাঁপা আঙুলে কার্ডটার নিচের ক্যাপটা খুলল এবং সুড়ঙ্গের দেওয়ালের পাশে পড়ে থাকা একটা নষ্ট হয়ে যাওয়া জেনারেটরের ইউএসবি পোর্টের সঙ্গে সেটা যুক্ত করার চেষ্টা করল।

ভাগ্যক্রমে জেনারেটরটার ভেতরের একটা ছোট ইমার্জেন্সি সার্কিট তখনো সামান্য সচল ছিল।

*বিপ...* করে একটা মৃদু শব্দ হলো।

কার্ডের সঙ্গে যুক্ত ছোট্ট একটা প্রজেকশন স্ক্রিন রিয়ার চোখের সামনে জ্বলে উঠল। স্ক্রিনে কোনো ভিডিও বা টেক্সট নয়, বরং ভেসে উঠল একটি থ্রি-ডি ব্রেন স্ক্যান রিপোর্ট এবং তার নিচে বড় বড় লাল অক্ষরে লেখা—*'প্রজেক্ট সাইরেন: সাবজেক্ট ০‌১ — রিয়া দেববর্মন।'*

রিয়া শ্বাসরুদ্ধ হয়ে সেই স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল। স্কিনের ওপরে একটা অডিও ফাইলের আইকন দেখা যাচ্ছে। সে কাঁপতে কাঁপতে অডিও ফাইলটায় টাচ করল।

মুহূর্তের মধ্যে সুড়ঙ্গের সেই জমাট অন্ধকারের ভেতর থেকে একটা চেনা গলা ভেসে এল—সেটা খোদ রিয়ার নিজের গলা! কিন্তু সেই কণ্ঠস্বরে আজকের এই আতঙ্কিত রিয়ার কোনো মিল নেই; সেদিনের সেই কণ্ঠস্বর ছিল সম্পূর্ণ শান্ত, ঠান্ডা এবং গাণিতিক যুক্তিতে ভরা।

অডিওতে রিয়া বলছিল—

*"প্রজেক্ট সাইরেনের প্রথম ধাপ সফল হয়েছে। সাবজেক্ট ০‌১-এর দীর্ঘমেয়াদী স্মৃতি সফলভাবে মুছে ফেলা হয়েছে এবং নতুন কৃত্রিম স্মৃতি প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। এই পরীক্ষার সফলতা প্রমাণ করে, মানুষের মনকে ইচ্ছেমতো রিসেট করা সম্ভব। আর এর প্রধান গবেষক হিসেবে..."*

কথাটা শেষ হওয়ার আগেই রিয়ার মাথাটা চক্কর দিয়ে উঠল। সে দুই হাতে কান চেপে ধরে ফিসফিস করে কেঁদে ফেলল, "না! এ কি শুনছি আমি! এই গলা... এই কথাগুলো কি আমার? আমি নিজে... আমি নিজে এই ভয়ঙ্কর প্রজেক্টের গবেষক ছিলাম?"

রিয়া কি তবে কোনো নির্দোষ শিকার নয়, বরং সে নিজেই এই অন্ধকারের স্রষ্টা?

ঠিক তখনই মাথার ওপর খাদের ঠিক পাশেই কারো ভারী জুতোর শব্দ শোনা গেল—"এই তো এখানে একটা ছোট শ্যাফ্ট আছে! মনে হচ্ছে ও এদিকেই গেছে!"

রিয়ার রক্ত হিম হয়ে এল। সে মেমোরি কার্ডটা মুঠোয় খামচে ধরে অন্ধকারের গভীরে আরও সামনের দিকে ছুটে চলল।

চলবে…

🕔 আগামীকাল ঠিক বিকেল ৫টায় প্রকাশিত হবে **"অন্ধকারের সাক্ষী"**-এর পরবর্তী পর্ব। সঙ্গে থাকুন!

✍️ ডা. শ্রীহরি দেববর্মন

Copyright © কপিরাইট ২০২৬, অনুভবের ডায়েরি। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।

#অন্ধকারের_সাক্ষী #পর্ব_২০ #অনুভবের_ডায়েরি #সাইকোলজিক্যাল_থ্রিলার #ধারাবাহিক_উপন্যাস

21/08/2026

মানুষ চেনা সহজ নয়। সুসময়ে তো সবাই পাশে থাকে, কিন্তু দুঃসময়ে যারা হাতটা ধরে রাখে তারাই আসল আপন। আপনার জীবনে এমন মানুষটি কে? তাকে মেনশন করে ধন্যবাদ জানান। ❤️ #অনুভবের_ডায়েরি

🌹 বিশ্বাসের ওপারে 🌹         পর্ব ১১পরম সত্তা যদি সর্বশক্তিমান হন—“সর্বশক্তিমান” কথাটির অর্থ কী?সেদিন অয়ন একটা অদ্ভুত প্...
20/08/2026

🌹 বিশ্বাসের ওপারে 🌹

পর্ব ১১

পরম সত্তা যদি সর্বশক্তিমান হন—

“সর্বশক্তিমান” কথাটির অর্থ কী?

সেদিন অয়ন একটা অদ্ভুত প্রশ্ন নিয়ে বসেছিল।

চারজনের সামনে চার কাপ চা। কিন্তু আজ চায়ের চেয়ে প্রশ্নটাই বেশি গরম।

রাহুল বলল,

— আজকের বিষয়টা কী?

অয়ন বলল,

— একটা মাত্র শব্দ।

— কোন শব্দ?

— সর্বশক্তিমান।

ড্যানিয়েল বলল,

— এর আবার কী সমস্যা? সর্বশক্তিমান মানে তো সবকিছু করতে পারেন।

অয়ন মুচকি হাসল।

— সত্যিই?

আরিফ বলল,

— তাহলে?

অয়ন টেবিলের ওপর একটা কাগজ রাখল।

তারপর লিখল—

“সর্বশক্তিমান সত্তা কি এমন কিছু করতে পারেন, যা করা যুক্তিগতভাবেই অসম্ভব?”

চারজনই কাগজটার দিকে তাকিয়ে রইল।

অয়ন বলল,

— এখান থেকেই আজকের আলোচনা শুরু করা যাক।

---

সর্বশক্তিমান মানে কি “সবকিছু করতে পারেন”?

সাধারণভাবে আমরা “সর্বশক্তিমান” বলতে বুঝি—

যার ক্ষমতার কোনো সীমা নেই।

অর্থাৎ তাঁর ক্ষমতার বাইরে কিছু নেই।

পরম সত্তার ধারণার সঙ্গে যখন “সর্বশক্তিমান” শব্দটি ব্যবহার করা হয়, তখন সাধারণত বোঝানো হয়—তিনি মহাবিশ্বের যেকোনো শক্তির চেয়ে অসীমভাবে ক্ষমতাবান এবং প্রকৃতির নিয়ম তাঁর ক্ষমতাকে সীমাবদ্ধ করে না।

কিন্তু এখানেই একটা সমস্যা।

যদি বলি—

“তিনি সবকিছু করতে পারেন।”

তাহলে “সবকিছু” বলতে ঠিক কী বোঝাচ্ছি?

তিনি কি এমন একটি বৃত্ত বানাতে পারেন, যেটি একই সঙ্গে পুরোপুরি বর্গাকার?

তিনি কি এমন একটি বস্তু তৈরি করতে পারেন, যেটি একই সময়ে সম্পূর্ণভাবে আছে এবং সম্পূর্ণভাবে নেই?

তিনি কি এমন একটি কাজ করতে পারেন, যার সংজ্ঞাটাই পরস্পরবিরোধী?

এই প্রশ্নগুলো শুনতে হয়তো শব্দের খেলা মনে হয়।

আসলে এগুলো বহু পুরোনো দার্শনিক প্রশ্ন।

---

“অসম্ভব” বলতে কী বোঝায়?

এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য করতে হবে।

দুই ধরনের অসম্ভবতা আছে।

প্রথমটি—শারীরিক অসম্ভবতা।

যেমন পৃথিবীতে একজন সাধারণ মানুষ নিজের শরীরের শক্তিতে আকাশে উড়তে পারবেন না।

কিন্তু প্রযুক্তির সাহায্যে বিমান বানিয়ে উড়তে পারেন।

অর্থাৎ প্রকৃতির সাধারণ সীমাবদ্ধতা প্রযুক্তি বা অন্য কোনো উপায়ে অতিক্রম করা সম্ভব হতে পারে।

দ্বিতীয়টি—যুক্তিগত অসম্ভবতা।

যেমন—

একটি অবিবাহিত বিবাহিত পুরুষ।

শব্দগুলো আলাদা আলাদা অর্থপূর্ণ।

কিন্তু একসঙ্গে বসালে ধারণাটাই পরস্পরবিরোধী।

অথবা—

একটি বর্গাকার বৃত্ত।

এখানে সমস্যা হলো কোনো ক্ষমতার অভাব নয়।

সমস্যা হলো—

এমন কোনো বস্তু বা অবস্থার অর্থই সুসংগত নয়।

তাই “সর্বশক্তিমান” মানে যদি যুক্তিগত বিরোধকে সত্য করে ফেলা হয়, তাহলে শব্দটির অর্থই ভেঙে যায়।

---

তাহলে কি সর্বশক্তিমান সত্তা কিছু করতে পারেন না?

এখানেই ভাষার একটা সূক্ষ্ম ব্যাপার আছে।

একজন দার্শনিক বলতে পারেন—

সর্বশক্তিমান হওয়া মানে সব ধরনের অর্থপূর্ণ কাজ করতে সক্ষম হওয়া; অর্থহীন বা স্ববিরোধী বিষয়কে “কাজ” বলা যায় না।

অর্থাৎ—

বর্গাকার বৃত্ত তৈরি করতে না পারা কোনো ক্ষমতার দুর্বলতা নয়।

কারণ “বর্গাকার বৃত্ত” আদৌ একটি সুসংগত বস্তু নয়।

যেমন আপনি যদি জিজ্ঞেস করেন—

“একজন মানুষ কি একই সময়ে সম্পূর্ণ জীবিত এবং সম্পূর্ণ মৃত হতে পারেন?”

প্রশ্নটির মধ্যেই পরস্পরবিরোধী ধারণা রয়েছে।

তাই “সর্বশক্তিমান” শব্দটাকে এমনভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয় না যে তিনি যুক্তির মৌলিক নিয়মকেও বাতিল করে দিতে পারবেন।

---

এবার আসল প্রশ্ন

রাহুল বলল,

— তাহলে সর্বশক্তিমান মানে “যা খুশি তাই করা” নয়?

অয়ন বলল,

— ঠিক।

— তাহলে?

— বরং বলা ভালো—

যে কোনো যৌক্তিকভাবে সম্ভব কাজ করার অসীম ক্ষমতা।

ড্যানিয়েল বলল,

— কিন্তু এটাও তো একটা সংজ্ঞা।

— অবশ্যই।

— তাহলে অন্য কেউ অন্যভাবে সংজ্ঞা দিলে?

— সেখানেই দর্শনের আলোচনা শুরু।

---

সর্বশক্তিমান কি প্রকৃতির নিয়মের বাইরে?

এবার আরিফ প্রশ্ন করল,

— ধরো, পরম সত্তা সত্যিই সর্বশক্তিমান। তাহলে কি তিনি প্রকৃতির নিয়ম ভেঙে দিতে পারেন?

অয়ন বলল,

— ধর্মীয় ও দার্শনিক চিন্তায় এর বিভিন্ন উত্তর আছে।

একটি ধারণা হলো—

প্রকৃতির নিয়ম পরম সত্তার সৃষ্টি বা প্রতিষ্ঠিত নিয়ম।

তাই তিনি চাইলে বিশেষ কোনো পরিস্থিতিতে সাধারণ নিয়মের বাইরে কিছু ঘটাতে পারেন।

যেমন মানুষ যাকে অলৌকিক ঘটনা বলে।

কিন্তু এখানে আবার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আসে—

কোনো ঘটনা অলৌকিক বলার আগে আমাদের কাছে তার প্রমাণ কতটা শক্তিশালী?

কারণ কোনো ঘটনা আমরা এখনো ব্যাখ্যা করতে পারিনি বলেই সেটা অলৌকিক—এটা বলা যায় না।

“আমি জানি না” আর “এটা অতিপ্রাকৃত”—দুটি একই কথা নয়।

---

তাহলে অলৌকিক ঘটনা নিয়ে কীভাবে ভাবব?

ধরুন, একজন মানুষ বললেন—

“আমি এমন একটি ঘটনা দেখেছি, যা কোনো প্রাকৃতিক নিয়ম দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না।”

এখানে অন্তত তিনটি সম্ভাবনা থাকতে পারে।

প্রথমত: সত্যিই এমন কিছু ঘটেছে যা আমরা এখনো ব্যাখ্যা করতে পারছি না।

দ্বিতীয়ত: ঘটনাটি সত্যি ঘটেছে, কিন্তু তার স্বাভাবিক ব্যাখ্যা আমরা এখনো খুঁজে পাইনি।

তৃতীয়ত: ঘটনাটি দেখার বা মনে রাখার ক্ষেত্রে ভুল হয়েছে।

তাই “অব্যাখ্যাত” থেকে সরাসরি “অলৌকিক”—এই লাফটা যুক্তিগতভাবে নিরাপদ নয়।

---

সর্বশক্তিমান এবং স্বাধীন ইচ্ছা

এবার ড্যানিয়েল একটু অন্য প্রশ্ন করল।

— একটা বিষয় আরও কঠিন।

— কী?

— যদি পরম সত্তা সর্বশক্তিমান হন এবং সবকিছুর ওপর তাঁর ক্ষমতা থাকে, তাহলে মানুষের স্বাধীন ইচ্ছা কোথায়?

চারজনই একটু চুপ হয়ে গেল।

প্রশ্নটা সত্যিই গভীর।

ধরুন, একজন মানুষ নিজের ইচ্ছায় ভালো কাজ করলেন।

আরেকজন নিজের ইচ্ছায় অপরাধ করলেন।

যদি পরম সত্তা সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করেন, তাহলে মানুষের সিদ্ধান্ত কতটা স্বাধীন?

আবার যদি মানুষ সম্পূর্ণ স্বাধীন হয়, তাহলে কি এমন কিছু আছে যা পরম সত্তা নিজের ইচ্ছায় নিয়ন্ত্রণ করেন না?

এখানে দর্শনে free will এবং divine omnipotence নিয়ে দীর্ঘ বিতর্ক রয়েছে।

একটি সম্ভাব্য উত্তর হলো—

পরম সত্তা মানুষকে স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দিয়েছেন; তাই মানুষের সব সিদ্ধান্ত তিনি নিজের ইচ্ছায় বাধ্যতামূলকভাবে নিয়ন্ত্রণ করেন না।

কিন্তু সংশয়বাদী আবার প্রশ্ন করতে পারেন—

> তাহলে সর্বশক্তিমান ক্ষমতার সঙ্গে মানুষের স্বাধীনতার সম্পর্কটি ঠিক কী?

এটা সহজ প্রশ্ন নয়।

---

“সর্বশক্তিমান” আর “সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করেন”—একই কথা নয়

এই পার্থক্যটা খুব গুরুত্বপূর্ণ।

একজন শিক্ষক তাঁর ছাত্রকে স্বাধীনভাবে উত্তর দেওয়ার সুযোগ দিলেন।

তার মানে শিক্ষক দুর্বল নন।

তিনি চাইলে ছাত্রকে উত্তর বলে দিতে পারেন।

কিন্তু তিনি তা না করে ছাত্রকে নিজের মতো চিন্তা করার সুযোগ দিলেন।

একইভাবে, কোনো ধর্মীয় দর্শনে যদি বলা হয় যে মানুষকে স্বাধীন ইচ্ছা দেওয়া হয়েছে, তাহলে “সর্বশক্তিমান” হওয়া এবং “প্রতিটি সিদ্ধান্তকে জোর করে নিয়ন্ত্রণ করা”—দুটি আলাদা ধারণা হতে পারে।

অর্থাৎ—

ক্ষমতা থাকা এবং প্রতিটি মুহূর্তে সেই ক্ষমতা ব্যবহার করা এক জিনিস নয়।

এটা শুধু ধর্মের ক্ষেত্রেই নয়।

একজন অত্যন্ত ক্ষমতাবান মানুষও সব সময় নিজের ক্ষমতা ব্যবহার করেন না।

---

সর্বশক্তিমান হলে পৃথিবীতে কষ্ট কেন?

এবার রাহুল আগের আলোচনার দিকে ফিরল।

— তাহলে আগের প্রশ্নটা আবার ফিরে আসে।

— কোনটা?

— পৃথিবীতে এত কষ্ট, অন্যায়, রোগ, মৃত্যু—যদি পরম সত্তা সবকিছু করতে পারেন, তাহলে এগুলো থামান না কেন?

এটাই আবার Problem of Evil-এর দিকে নিয়ে যায়।

একজন বিশ্বাসী বলতে পারেন—

মানুষের স্বাধীন ইচ্ছার কারণে অনেক অশুভ ঘটে।

প্রকৃতির একটি নিয়মিত ও স্থিতিশীল ব্যবস্থা না থাকলে মানুষের জীবন সম্ভব হতো না।

কষ্টের মধ্যেও কিছু মূল্য, শিক্ষা বা নৈতিক বিকাশ ঘটতে পারে।

পরম সত্তার পরিকল্পনা মানুষের সম্পূর্ণ বোধের বাইরে হতে পারে।

কিন্তু একজন সংশয়বাদী জিজ্ঞেস করতে পারেন—

“কিছু কষ্ট যদি স্বাধীন ইচ্ছা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়, তাহলে শিশুর রোগ বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো কষ্ট কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?”

এই প্রশ্নের সহজ উত্তর নেই।

আর এখানেই বোঝা যায়—

“সর্বশক্তিমান” শব্দটি যত সহজ মনে হয়, ধারণাটি তত সহজ নয়।

---

সর্বশক্তিমান কি নিজের সিদ্ধান্ত বদলাতে পারেন?

অয়ন এবার আরেকটা প্রশ্ন তুলল।

— ধরো, পরম সত্তা আজ একটি সিদ্ধান্ত নিলেন।

আগামীকাল কি তিনি সেই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে পারবেন?

রাহুল বলল,

— নিশ্চয়ই।

— তাহলে তিনি কি গতকাল ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন?

— না, এমন নয়।

— তাহলে কেন পরিবর্তন?

ড্যানিয়েল বলল,

— পরিস্থিতি বদলাতে পারে।

অয়ন বলল,

— ঠিক।

এখানে আবার “সর্বশক্তিমান” এবং “পরম জ্ঞান” একসঙ্গে ভাবতে হয়।

যদি কোনো সত্তা সর্বজ্ঞ হন—অর্থাৎ সবকিছু জানেন—তাহলে তাঁর সিদ্ধান্তের প্রকৃতি কেমন হবে?

তিনি কি ভবিষ্যতের সব সম্ভাবনাও জানেন?

নাকি ভবিষ্যৎ কিছু অংশ সত্যিকার অর্থে অনির্ধারিত?

এগুলো দর্শনের গভীর প্রশ্ন।

এখানে আমরা এখনই কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে যাব না।

শুধু বুঝব—

একটি ধর্মীয় ধারণার সঙ্গে আরেকটি ধারণা যুক্ত হলে নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়।

---

সর্বশক্তিমান এবং সর্বজ্ঞ—একই জিনিস নয়

অনেক সময় আমরা দুটোকে এক করে ফেলি।

সর্বশক্তিমান = অসীম ক্ষমতা।

সর্বজ্ঞ = সবকিছু জানা।

একটি সত্তা যদি সর্বশক্তিমান হয়, তা থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রমাণ হয় না যে তিনি সর্বজ্ঞ।

আবার সর্বজ্ঞ হলেই সর্বশক্তিমান হওয়া প্রমাণিত হয় না।

ধর্মীয় দর্শনে অনেক সময় দুটোই একই পরম সত্তার গুণ হিসেবে বিবেচিত হয়।

তখন প্রশ্নও বাড়ে।

যদি তিনি—

সব জানেন,

সব করতে পারেন,

এবং পরম কল্যাণময় হন,

তাহলে পৃথিবীতে এত অশুভ কেন?

এই তিনটি বৈশিষ্ট্য একসঙ্গে কীভাবে বোঝানো যায়?

এটাই আগের পর্বগুলোর সঙ্গে আজকের আলোচনাকে যুক্ত করে।

---

একটি সহজ উদাহরণ

অয়ন একটা দাবার বোর্ড বের করল।

সে বলল,

— ধরো, একজন খেলোয়াড় দাবার প্রতিটি নিয়ম জানেন এবং অসাধারণ দক্ষ।

রাহুল বলল,

— ঠিক আছে।

— তিনি কি প্রতিপক্ষের প্রতিটি চাল জোর করে নিজের ইচ্ছামতো করাতে পারেন?

— তাহলে তো আর প্রতিপক্ষের স্বাধীন চাল থাকবে না।

— ঠিক।

— কিন্তু তিনি প্রতিপক্ষের চাল অনুমান করতে পারেন।

— হ্যাঁ।

— আবার এমনও হতে পারে যে তিনি প্রতিপক্ষকে স্বাধীনভাবে খেলতে দিয়েও শেষ পর্যন্ত নিজের কৌশল সফল করেন।

অয়ন বলল,

— এটাই শুধু একটা উপমা। পরম সত্তার সঙ্গে পুরোপুরি তুলনা করা যাবে না।

কিন্তু এটি আমাদের একটি ধারণা বুঝতে সাহায্য করে—

কোনো কিছুর ওপর সর্বোচ্চ ক্ষমতা থাকা এবং তার প্রতিটি ক্ষুদ্র ঘটনাকে সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করা—একই বিষয় নয়।

---

তাহলে “সর্বশক্তিমান” কথাটার সবচেয়ে যুক্তিসঙ্গত অর্থ কী?

চারজন এবার একটা সংজ্ঞা তৈরির চেষ্টা করল।

রাহুল বলল,

— “যিনি সবকিছু করতে পারেন।”

আরিফ বলল,

— খুব সাধারণ।

ড্যানিয়েল বলল,

— “যাঁর ক্ষমতার কোনো সীমা নেই।”

অয়ন বলল,

— এটাও ভালো, কিন্তু যুক্তিগত অসম্ভবতার প্রশ্ন থেকে যায়।

শেষে অয়ন লিখল—

“সর্বশক্তিমান বলতে এমন এক সত্তাকে বোঝানো যেতে পারে, যার ক্ষমতা বাস্তব জগতের কোনো সসীম শক্তির মতো সীমাবদ্ধ নয় এবং যিনি যা কিছু যৌক্তিকভাবে সম্ভব, তা করতে সক্ষম।”

তিনজনই কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল।

রাহুল বলল,

— এটা আগের চেয়ে অনেক বেশি পরিষ্কার।

অয়ন বলল,

— কিন্তু এটাও মনে রাখতে হবে—

এটা একটি দার্শনিক সংজ্ঞা।

এটা নিজে থেকে প্রমাণ করে না যে এমন একজন সত্তা বাস্তবেই আছেন।

---

আর এখানেই আজকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য

আমরা তিনটি প্রশ্নকে আলাদা রাখব।

প্রশ্ন এক:

সর্বশক্তিমান বলতে কী বোঝায়?

এটা সংজ্ঞার প্রশ্ন।

প্রশ্ন দুই:

এমন কোনো সত্তা সত্যিই আছেন কি?

এটা অস্তিত্বের প্রশ্ন।

প্রশ্ন তিন:

যদি থাকেন, তাঁকে কীভাবে জানা যায়?

এটা জ্ঞানের প্রশ্ন।

এই তিনটি প্রশ্ন এক নয়।

আগের অনেক আলোচনায় আমরা দেখেছি—মানুষ প্রায়ই এগুলো একসঙ্গে মিশিয়ে ফেলে।

কেউ বলেন—

“সর্বশক্তিমান সত্তা আছেন।”

কিন্তু আগে “সর্বশক্তিমান” শব্দের অর্থ পরিষ্কার করা হয়নি।

আবার কেউ বলেন—

“এমন সত্তা নেই।”

কিন্তু তিনি কোন সংজ্ঞার সত্তাকে অস্বীকার করছেন, সেটাও পরিষ্কার নয়।

তাই ভালো আলোচনার প্রথম শর্ত—

শব্দের অর্থ পরিষ্কার করা।

---

একটি মজার প্রশ্ন

ড্যানিয়েল হঠাৎ বলল,

— তাহলে আমি একটা প্রশ্ন করি।

— করো।

— সর্বশক্তিমান সত্তা কি এমন একটা পাথর বানাতে পারেন, যেটা তিনি নিজেই তুলতে পারবেন না?

রাহুল হেসে ফেলল।

— এই প্রশ্নটাই তো বিখ্যাত!

অয়নও হাসল।

— হ্যাঁ। এটাকে omnipotence paradox-এর একটি পরিচিত রূপ বলা যায়।

যদি তিনি পাথর তুলতে না পারেন, তাহলে সর্বশক্তিমান নন।

আর যদি এমন পাথরই বানাতে না পারেন, তাহলেও মনে হচ্ছে তাঁর ক্ষমতার সীমা আছে।

তাহলে?

এখানে উত্তরটা আবার একই জায়গায় ফিরে আসে—

“নিজের চেয়ে না-তোলা-সম্ভব এমন পাথর” তৈরি করা আসলে কী ধরনের কাজ?

এটা কি সত্যিই একটি যৌক্তিকভাবে সুসংগত কাজ?

নাকি প্রশ্নটির মধ্যেই পরস্পরবিরোধী শর্ত ঢোকানো হয়েছে?

যদি দ্বিতীয়টি হয়, তাহলে সমস্যাটি ক্ষমতার সীমা নয়।

সমস্যাটি প্রশ্নটির যুক্তিগত কাঠামো।

---

আজকের আলোচনায় আমরা কী শিখলাম?

প্রথমত, “সর্বশক্তিমান” মানে সাধারণ অর্থে “যা খুশি তাই করা” নয়।

দ্বিতীয়ত, যুক্তিগতভাবে অসম্ভব বিষয়কে “কাজ” হিসেবে ধরলে ধারণাটিই অসংগত হয়ে যেতে পারে।

তৃতীয়ত, সর্বশক্তিমান ও সর্বজ্ঞ এক নয়।

চতুর্থত, ক্ষমতা থাকা এবং প্রতিটি মুহূর্তে সেই ক্ষমতা ব্যবহার করা এক নয়।

পঞ্চমত, সর্বশক্তিমান সত্তার ধারণা থেকে তাঁর অস্তিত্ব নিজে থেকে প্রমাণিত হয় না।

ষষ্ঠত, তাঁর অস্তিত্ব, তাঁর ক্ষমতার প্রকৃতি এবং মানুষ কীভাবে তাঁকে জানবে—এগুলো আলাদা প্রশ্ন।

---

চা শেষ হয়ে গিয়েছিল।

কিন্তু আলোচনার শেষ হয়নি।

রাহুল উঠে দাঁড়িয়ে বলল,

— আজ একটা জিনিস বুঝলাম।

অয়ন বলল,

— কী?

— আগে ভাবতাম “সর্বশক্তিমান” মানে যার পক্ষে কোনো অসম্ভব বলে কিছু নেই।

অয়ন বলল,

— এখন?

রাহুল বলল,

“এখন মনে হচ্ছে, ‘অসম্ভব’ কথাটার অর্থ না বুঝলে ‘সর্বশক্তিমান’ কথাটার অর্থও বোঝা যায় না।”

আরিফ বলল,

— আর আমার মনে হচ্ছে আরও একটা প্রশ্ন আছে।

ড্যানিয়েল বলল,

— কী?

আরিফ ধীরে বলল,

“যদি পরম সত্তা সর্বশক্তিমান হন, তাহলে তিনি কি নিজের তৈরি নিয়মের অধীন—নাকি নিয়মগুলোও তাঁর ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল?”

অয়ন মৃদু হাসল।

— এই প্রশ্নটা রেখে দাও।

— কেন?

— কারণ এখান থেকেই আমাদের পরের দরজা খুলবে।

চারজন বেরিয়ে গেল।

রাস্তায় তখন রাতের বাতাস।

কেউ আজ জিতল না।

কেউ হারল না।

কিন্তু একটা শব্দ—

“সর্বশক্তিমান”

আজ তাদের কাছে আগের চেয়ে অনেক বেশি কঠিন হয়ে গেল।

আর হয়তো কোনো ধারণাকে সত্যিই বোঝার প্রথম লক্ষণই হলো—

যে শব্দটা আগে খুব সহজ মনে হতো, সেটাকেই নতুন করে প্রশ্ন করতে শেখা।

---

আজকের প্রশ্ন

আপনার কাছে “সর্বশক্তিমান” কথাটার অর্থ কী?

যদি কোনো সত্তা সত্যিই সর্বশক্তিমান হন—

তাহলে কি তিনি যুক্তিগতভাবে অসম্ভব কাজও করতে পারবেন?

নাকি “সর্বশক্তিমান” মানে হলো—

যা কিছু যৌক্তিকভাবে সম্ভব, তার সবকিছু করার ক্ষমতা থাকা?

আপনার যুক্তিটা কী?

আপনার মতামত জানাতে কমেন্ট করুন।

ভিন্ন বিশ্বাসকে আঘাত নয়—

প্রশ্নটাকে আরও পরিষ্কার করাই আমাদের উদ্দেশ্য।

— অনুভবের ডায়েরি

“সর্বশক্তিমান” মানে কি সত্যিই সবকিছু করা, নাকি যুক্তিগতভাবে সম্ভব সবকিছু করার ক্ষমতা? আপনার মতামত জানাতে কমেন্ট করুন।

Copyright © ২০২৬ অনুভবের ডায়েরি — সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।

#বিশ্বাসেরওপারে #যুক্তিরআলোচনা #ধর্মীয়বিশ্বাস #অনুভবেরডায়েরি

Address

Bishnupur
Bankura

Website

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when অনুভবের ডায়েরি posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Shortcuts

Share

Category