08/08/2026
আপনি যখন ডাক্তারের কাছে যাবেন, তখন আপনার মোট চিকিৎসা খরচের মাত্র ৫-১৫% খরচ হয় ডাক্তারের ভিজিটে।
বাকি ৮৫-৯৫% খরচটার অর্ধেকেরও বেশি যায় ওষুধে, বাকিটা টেস্টে।
সব মিলিয়ে, আপনার মোট চিকিৎসা খরচের মোটামুটি ৪০-৫০%ই আসলে ওষুধের খরচ। ভিজিটের খরচ মাত্র ৫-১৫%।
এবং বাংলাদেশ যেহেতু এখানে স্বল্পোন্নত দেশ, তাই এখানে দরিদ্র মানুষের সংখ্যাই বেশি। এখানে সবচেয়ে দরকারি ওষুধগুলোর দাম তাই সরকারকে নির্ধারন করে দেয়া লাগে।
বাংলাদেশ সরকার তাই ১১৭টি এসেনশিয়াল ড্রাগের দাম ১৯৯৪ সালে নির্ধারন করে দেয়, যে তালিকা পরে আর লম্বা করা হয়নি- মূলত ওষুধ কোম্পানিদের চাপে।
কিন্তু এই ওষুধগুলোর একটা বড় অংশই ডাক্তাররা আর ব্যবহার করেন না। ঐদিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় ওষুধের দাম বেড়েই চলেছে।
এ অবস্থাতেই ২০২৪ এর জুলাইয়ের বিপ্লবে ফ্যাসিবাদী সরকারের পতন হয়, ক্ষমতায় আসে নোবেলবিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার।
ক্ষমতায় এসে ইন্টেরিম সরকার দেখল- এই তালিকা হালনাগাদ করতে হবে, আরো অধিক সংখ্যক ওষুধের দাম নির্ধারন করতে হবে।
বহু জায়গার বহু চাপ সামলে, ইন্টেরিম গভমেন্ট দাম নির্ধারন করা ওষুধের তালিকা বাড়াল।
তারিখটা ছিল ৮ জানুয়ারি, ২০২৬।
দাম নির্ধারণ করা ওষুধের সংখ্যা দাঁড়ায় ১১৭ থেকে ২৯৫টি। বাকি ওষুধগুলোর দাম যথারীতি বেসরকারি ফার্মা কোম্পানিগুলো নির্ধারণ করবে।
১১৭টির বদলে ২৯৫টি ওষুধের দাম নির্ধারন করে দেয়ার এই ঘটনাটা জুলাই বিপ্লবের স্বাস্থ্যখাতে হওয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারগুলোর একটি।
কিন্তু সেই সংস্কারটা খুব বেশি দিন টিকল না।
আজকে ৮ মাসের মাথায় সেই সংস্কার বাতিল করা হয়েছে। এখন থেকে পূর্বের মতই ১১৭টি ওষুধের দাম নির্ধারন করা থাকবে। বাকিগুলোর দাম বেসরকারি ফার্মা কোম্পানিগুলোর হাতে ছেড়ে দেয়া হয়েছে।
অথচ দেশের অর্থনীতির অবস্থা স্মরণকালের সবচেয়ে ভয়াবহ, মানুষের হাতে টাকা নাই। কিভাবে চিকিৎসা করাবে?
কতটা খারাপ অবস্থা, শোনেন।
আমি নিজে চেম্বার ও অনলাইনে স্কিন, চুল এবং নখের রোগী দেখি। মাঝে মাঝেই দেখি, কিছু রোগী বলেন যে- আপনার অনলাইনের ৫১০ টাকা ভিজিটটা এ মুহুর্তে হবে না, পরে দেখাই। পরে বহু কষ্ট করে ভিজিটটা পে করে আমাকে দেখান।
চিন্তা করেন, ৫১০ টাকা মানুষের হাতে ক্যাশ থাকে না। এই অল্প কয়টা টাকা। অর্থনীতি এতটাই ধ্বংসের মুখে।
আর ওষুধ কিনতে এমনিতেই ভিজিটের ৭-৮ গুন বেশি টাকা খরচ হয়। এভারেজে ২-৩-৪ হাজার টাকার ওষুধ রোগভেদে লাগেই।
এই ৭-৮ গুন খরচটা এখন ১০-১২ গুন হবে সরকারের এ সিদ্ধান্তে। আপনি সব টেস্টসহ ৭-৮ হাজার টাকার কমে মোট চিকিৎসা খরচ আনতেই পারবেন না এখন। কম সিরিয়াস রোগগুলোতেও রেগুলারলিই এই খরচ ১০ হাজার ছাড়াবে।
আজকের দিনটা তাই দেশের স্বাস্থ্য খাতের ইতিহাসে একটি কালো অধ্যায় হয়ে থাকবে।
মানুষ দেখছে, দুই হাজার শহীদ ও ত্রিশ হাজার আহতের রক্তের, দৃষ্টিশক্তির এবং পঙ্গুত্বের বিনিময়ে আসা দেশের স্বাস্থ্যখাতের একটি বৃহৎ সংস্কারকে কিভাবে কলমের খোঁচায় নস্যাৎ করা হল।
একজন চিকিৎসক হিসেবে আমি সরকারের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে রাখলাম।